২১ আগস্ট: বাংলাদেশের রাজনীতির বিভক্তিরেখা

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৩:০২, আগস্ট ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:০৭, আগস্ট ২১, ২০২০

প্রভাষ আমিনবাংলাদেশে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৩৯টি, তবে সব মিলিয়ে দলের সংখ্যা শ’ ছাড়িয়ে যাবে। তবে বাংলাদেশের রাজনীতি মূলত দুই দলীয় ধারায় বিভক্ত। এই ধারার একদিকে আওয়ামী লীগ, অন্যদিকে অ্যান্টি আওয়ামী লীগ বা আওয়ামীবিরোধী অংশ। স্বাধীনতার আগে আওয়ামীবিরোধী ধারার নেতৃত্বে ছিল মুসলিম লীগ। স্বাধীনতার পর এই ধারার নেতৃত্ব দেয় জাসদ। ৭৫-এর পর থেকে আওয়ামীবিরোধী ধারার নেতৃত্ব চলে আসে ব্যক্তি জিয়াউর রহমানের হাতে। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশে আওয়ামীবিরোধী ধারার মূল নেতৃত্ব দিচ্ছে বিএনপি। এই ধারাটি এখন অনেকটাই কোণঠাসা, ক্ষীণ; তবু বাংলাদেশে অনেকদিন ধরেই রাজনীতি আওয়ামী লীগ-বিএনপি ধারায় বহমান। অপর বড় দুই দলের মধ্যে জামায়াত মিশে আছে বিএনপির সাথে, আর জাতীয় পার্টি মিশে গেছে আওয়ামী লীগের সাথে। মোটা দাগে আওয়ামী লীগ উদার, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের, প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ, কিছুটা ভারতপন্থী। আর বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী, সাম্প্রদায়িক শক্তির প্ল্যাটফর্ম এবং প্রবলভাবে পাকিস্তানপন্থী।
দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের মধ্যে আদর্শিক দ্বন্দ্ব থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। তবু গণতন্ত্রে পরমতসহিষ্ণুতা, সামাজিক সম্পর্ক, পারস্পরিক আস্থা-সম্মানের বিষয় থাকে। আওয়ামী লীগ-বিএনপির মূল বিভক্তি ১৫ আগস্ট।
যদিও তখন বিএনপির আনুষ্ঠানিক জন্মই হয়নি, তবু এই দলটির আদর্শিক জন্ম ৭৫ সালেই। ১৫ আগস্ট আদর্শিক জন্ম, ৭ নভেম্বর বিকাশ। ১৫ আগস্ট বিএনপির অস্তিত্ব ছিল না, জিয়াউর রহমানও সরাসরি এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না। তবে শেষ পর্যন্ত ১৫ আগস্টের মূল সুবিধাভোগী জিয়াউর রহমানই। সরাসরি জড়িত না থাকলেও জিয়াউর রহমান বিষয়টি জানতেন, জুনিয়রদের এগিয়ে যেতে বলেছেন; এটা নিশ্চিত। সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর নির্লিপ্ত প্রতিক্রিয়া, ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা এবং মরতে মরতে ৭ নভেম্বর ঘটনার কেন্দ্রে চলে আসেন জিয়া। তারপরও জিয়া চাইলে ১৫ আগস্টের দায় এড়াতে পারতেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার বন্ধ করতে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বহাল রেখে এবং খুনিদের দেশে-বিদেশে পুরস্কৃত ও পুনর্বাসিত করে জিয়াউর রহমান প্রমাণ করেন, মূল সুবিধাভোগী হিসেবে খুনিদের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞ। ১৫ আগস্টের সঙ্গে পরোক্ষ সম্পৃক্ততা থাকলেও আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যে সামাজিক সম্পর্ক  ছিল। রাজপথে সমান্তরাল আন্দোলনেও একটি অলিখিত সমঝোতাও ছিল। এরশাদের পতনের পর ক্ষমতায় এসে বেগম খালেদা জিয়া তার জন্মদিন হিসেবে ১৫ আগস্ট আবিষ্কার এবং তা ঘটা করে পালন শুরুর পর দুই দলের মধ্যে তিক্ততা বাড়ে। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ, খুনিদের পুনর্বাসন এবং ১৫ আগস্ট জন্মদিন উদযাপনের ঘটনা স্পষ্টতই আওয়ামী লীগের বেদনাকে আরও তীব্র করে। যা উল্লাস আনে আওয়ামীবিরোধী শিবিরে। তবে আওয়ামী লীগ-বিএনপি এই দুই ধারার মধ্যে দেয়াল তুলে দিয়েছে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা। ১৫ আগস্ট আর ২১ আগস্ট মিলে দেয়ালটা অলঙ্ঘনীয় করে তুলেছে।
দেশের বাইরে থাকায় ১৫ আগস্টের হত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা- শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। ১৫ আগস্ট খুনিদের চেষ্টা ছিল বঙ্গবন্ধু এবং তার স্বজনদের নিশ্চিহ্ন করা। অনেকেই ভেবেছিল ১৫ আগস্টের পর নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে আওয়ামী লীগও। কিন্তু ৮১ সালে দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের হাল ধরেন শেখ হাসিনা। ধ্বংসপ্রায় আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করেন এবং ২১ বছর পর আবার আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনেন। এখন তো বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা দল আওয়ামী লীগ। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট খুনিচক্র মাঠে নামে ৭৫-এর ১৫ আগস্টের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার মিশন নিয়ে। তখন ক্ষমতায় ছিল বিএনপি, শেখ হাসিনা ছিলেন বিরোধীদলীয় নেত্রী। তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে চালানো হয় নৃশংস এক গ্রেনেড হামলা। নিষ্ঠুর সে হামলায় ভাগ্যগুণে শেখ হাসিনা বেঁচে গেলেও নারীনেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন প্রাণ হারান।
বিরোধীদলীয় নেত্রীর ওপর হামলার বিষয়টি সরকারি দল গুরুত্বের সাথে নেবে, খুনিদের খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনবে; এটাই ছিল প্রত্যাশিত। কিন্তু বিএনপি সরকার করে উল্টো কাজ। শোকবিহ্বল মানুষের ওপর গুলি আর টিয়ারগ্যাস মেরে বিএনপি সরকারের পুলিশ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছিল। তারপর ঘটনাস্থলে পানি মেরে আলামত নষ্ট করা, আওয়ামী লীগের অন্তর্দ্বন্দ্ব, শেখ হাসিনা ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে এসেছিলেন ইত্যাদি হাস্যকর সব কথা বলে বিএনপি সন্দেহের সৃষ্টি করে। শেষ পর্যন্ত জজ মিয়া নামে এক হকারকে আটক করে পুরো বিষয়টিকেই হাস্যকর করে তোলে। এসব করে গ্রেনেড হামলার সাথে নিজেদের সম্পৃক্ততার সন্দেহ বিএনপিই তৈরি করেছিল। সেই সন্দেহের ধোঁয়া থেকে দাউ দাউ আগুন জ্বলে ওয়ান-ইলাভেন আমলের তদন্তে। জানা যায়, হকার জজ মিয়া তো নয়ই, ২১ আগস্ট আসলে রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তায় একটি বহুমাত্রিক ষড়যন্ত্রের ফল। সেখানে জঙ্গিরা যেমন আছে, ১৫ আগস্টের খুনিচক্রও আছে। আর আছে বিএনপি সরকার। অবিশ্বাস্য হলেও এটা এখন আদালতে প্রমাণিত সত্য, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানের উপস্থিতিতে গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনা হয়েছে। বৈঠক হয়েছে তখনকার বিকল্প ক্ষমতার কেন্দ্র ‘হাওয়া ভবন’ আর উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর সরকারি বাসায়। তখনকার প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আগে না হলেও হামলার পরে বিষয়টি জেনেছেন বলেই ঘটনাপ্রবাহে মনে হয়। তদন্তের নামে বিভ্রান্ত করার দায় তাকেও নিতে হবে।
২০০৮ সালে দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর থেকে আওয়ামী লীগ সরকার তথা শেখ হাসিনা বিএনপির ওপর একটু বেশিই খড়্গহস্ত। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বড় প্রভাব পড়েছে বিএনপি-জামায়াত জোটে। ওয়ান-ইলাভেনের সময় থেকেই যুক্তরাজ্যে পালিয়ে আছে ২১ আগস্ট মামলায় যাবজ্জীবন দণ্ডিত তারেক রহমান। দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত বেগম খালেদা জিয়াও দুই বছরের বেশি কারাভোগ করে এখন জামিনে আছেন।
রাজপথে বিএনপির অবস্থান শূন্য, সংসদে হাতেগোনা। মামলা-হামলা-গুম-খুনে বিপর্যস্ত বিএনপি। একসময়কার দাপুটে বিএনপিকে এখন বড্ড বিবর্ণ লাগে। গণতন্ত্রের জন্য যাদের দীর্ঘ সংগ্রাম সেই আওয়ামী লীগের কাছে এমন আচরণ মোটেই প্রত্যাশিত নয়। আরও অনেকের মতো আমিও আওয়ামী লীগের এ ধরনের আচরণের নিন্দা জানাই। কিন্তু আমি যখন শেখ হাসিনার অবস্থান থেকে ভাবি, তখন তাকে অত নিষ্ঠুর মনে হয় না। যারা তাকে গ্রেনেড মেরে হত্যা করতে চেয়েছে, তিনি তাদের প্রতি সদয় থাকবেন না, এটা স্বাভাবিক। তিনি যদি পাল্টা গ্রেনেড মারতেন, তাহলে তাকে প্রতিশোধপরায়ণ বলা যেতো। কিন্তু তিনি রাজনৈতিকভাবে বিএনপি নিশ্চিহ্ন করার কৌশল নিয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা করেছে ওয়ান-ইলাভেন সরকার। আওয়ামী লীগ সরকার তা এগিয়ে নিয়েছে এবং আদালতের রায়ে কারাগারে গেছেন বেগম খালেদা জিয়া। আর তারেক রহমান পালিয়ে আছেন। আগের সরকারগুলোর ধারাবাহিকতায় এখনও দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলে বটে। তবে ব্যক্তিগতভাবে শেখ হাসিনাকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মনে হয়। ২১ বছর পর ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা চাইলে ক্রসফায়ারে বা গুম করে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের হত্যা করতে পারতেন। নিদেনপক্ষে, দ্রুত বিচার আইনে তিন মাসের মধ্যে তাদের ফাঁসিতে ঝোলাতে পারতেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিচার করতে শেখ হাসিনাকে দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসতে হয়েছে। বিএনপি আগে তো বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচারের পথ বন্ধ করে রেখেছিলই, কিন্তু আওয়ামী লীগ যখন সেই বাধা দূর করে বিচারের উদ্যোগ নিলো, বিএনপি সেটা চালিয়ে নেয়নি।
বিএনপির পাঁচ বছরের ক্ষমতায় থাকার সময়ে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলাটি ডিপ ফ্রিজে ছিল। তখন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ কূটকৌশলে বিচারের পথ রুদ্ধ করে রেখেছিলেন। তাই মওদুদ যখন গুলশানের বাড়ি হারিয়ে হায় হায় করেন, আমার তেমন খারাপ লাগে না। আমি জানি এটা শেখ হাসিনার আইনি প্রতিশোধ। শেখ হাসিনা তো বেগম খালেদা জিয়া বা ব্যারিস্টার মওদুদকে জোর করে বাড়ি ছাড়া করেননি, আদালতের দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া শেষেই সেটা হয়েছে। যা হওয়ার আদালতে হয়েছে, গ্রেনেড মেরে হয়নি। এগুলো হলো প্রতিশোধের সৌন্দর্য।
তবে বিএনপির প্রতি গত একযুগে আওয়ামী লীগ সরকার যে আচরণ করছে, আমি কোনোভাবেই তা সমর্থন করি না। আমি বারবার এর বিরুদ্ধে কলম ধরেছি।

তদন্ত এবং বিচার শেষ হয়ে গেলেও বিএনপির অনেকে এখনও বিশ্বাসই করেন না ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় তারেক রহমান জড়িত। তারা এখনও মনে করেন, তারেক রহমানকে ফাঁসানো হয়েছে। আবার অনেকে বিশ্বাস করেন, কিন্তু স্বীকার করেন না। কিন্তু দলীয় আনুগত্য যাদের চোখ অন্ধ করে দেয়নি তারা জানেন ২১ আগস্টের ঘটনাটা রাষ্ট্রযন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতায়ই হয়েছিল। তাই বিএনপিকে রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে, অতীতে অপকর্মের জন্য অনুশোচনা করতে হবে, অপরাধের জন্য সাজা ভোগ করতে হবে। বিএনপি যদি অপরাধ ভুলে নতুন করে শুরু করতে চায়, তাহলেই কেবল আওয়ামী লীগ-বিএনপির মাঝখানের দেয়ালটি লঙ্ঘন করা যাবে। নইলে তা অলঙ্ঘনীয়ই থেকে যাবে। ২১ আগস্ট হয়ে থাকবে আমাদের রাজনীতির স্থায়ী বিভক্তিরেখা।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ