জি কে শামীম, সম্রাট ফিরবেন হাসপাতালের ‘আরাম-আয়েশে’

Send
রুমিন ফারহানা
প্রকাশিত : ১৬:১৭, নভেম্বর ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১৮, নভেম্বর ২১, ২০২০

রুমিন ফারহানা‘আমরা অস্বীকার করছি না দেশে দুর্নীতি নেই, কিন্তু বর্তমান সরকার এমনকি নিজ দলের সদস্যদের দুর্নীতির বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে। সম্রাট, জি কে শামীম, শাহেদদের গ্রেফতার হওয়া প্রমাণ করে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলছে; দেশে আইনের শাসন আছে। এভাবেই সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান চালাচ্ছে এবং এই অভিযান চলবে।’ মোটামুটি নিয়মিত টিভি টক’শো, আলোচনা সভাতে যাই। যৌক্তিক কারণেই সহ-আলোচক হিসেবে থাকেন আওয়ামী লীগের প্রকাশ্য অথবা অপ্রকাশ্য (বুদ্ধিজীবী) সদস্যরা। উপরে বলা কথাগুলো বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের পক্ষের লোকজনের মুখ থেকে মোটামুটি নিয়মিতই শুনতে হয়। 
‘জি কে শামীমকে “ভিআইপি সেবা” হাসপাতালে’ শিরোনামে দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যায় গত ৫ এপ্রিল ডান হাতের চিকিৎসার জন্য তাকে কেরানীগঞ্জে স্থাপিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে পাঠানো হয়। চিকিৎসা শেষে দুই দিনের মধ্যে তাকে কারাগারে পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু না, সেই দুই দিন আর শেষ হয় না, কেটে যায় দীর্ঘ ৮ মাস। বিএসএমএমইউ হাসপাতালের প্রিজন্স অ্যানেক্স ভবনের চার তলায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত একটি কক্ষে শুয়ে-বসে দিন কেটেছে তার।   

আটক হওয়ার আগে জি কে শামীম সাতজন সশস্ত্র দেহরক্ষী নিয়ে ঘুরতেন। আর হাসপাতালেও তার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকতে হয়েছিল ৯ জনকে—পাঁচজন কারারক্ষী ও চার পুলিশ। শুনতে কারাবাস হলেও আরাম আয়েশের কমতি ছিল না কোনও। 

কারাগারে পাঠানোর তাগাদা দিয়ে কারা কর্তৃপক্ষ মোট ১২ বার চিঠি দিয়েছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। বিএসএমএমইউ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায় জনাব জি কে শামীম প্রেসার, ডায়াবেটিস, বুকে ব্যথা ইত্যাদি নানা কথা বলে হাসপাতালে থেকেছেন। পাঠক, যে রোগগুলোর কথা বলা হচ্ছে সেগুলোর জন্য কি একটানা ৮ মাস হাসপাতালে থাকতে হয়? 

এসব রোগ নিয়ে একেবারে স্বাভাবিক জীবন-যাপন করছেন এমন মানুষ এই দেশে লাখ লাখ। তাই চিকিৎসক না হয়েও জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বলতে পারি, জি কে শামীমের অসুখগুলো আসলে স্রেফ অজুহাত। জানি, কেউ বলতেই পারেন ডাক্তার না হয়ে আমি এমন মন্তব্য করতে পারি কিনা। মেনে নিলাম, পারি না।

কিন্তু এখানে আছে খুব চমকপ্রদ ঘটনা। এমন ভীষণ অসুস্থ একজন রোগী যাকে দীর্ঘ আট মাস হাসপাতালে থাকতে হলো, সেই রোগীকেই উক্ত আলোচিত রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। জি কে শামীমের ‘বাড়া ভাতে ছাই’ পড়লো। 

এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে জি কে শামীম যদি এত ভয়ংকরভাবে অসুস্থই হয়ে থাকেন যে তাকে ৮ মাস ধরে টানা হাসপাতালে রাখতে হয়েছে, তাহলে তাকে এখন কেন ছেড়ে দেওয়া হলো। আবার তার যদি হাসপাতালে ভর্তি থাকার মতো তেমন কোনও অসুস্থতা না থেকে থাকে, তাহলে কেন তাকে এতদিন হাসপাতালে রাখা হয়েছে। তার চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা চিকিৎসককেও এই ব্যাপারে আইনের অধীনে আনা উচিত। কিন্তু না, এই দেশে ওসবের বালাই নেই। 

আমাদের এটা বোঝার কাণ্ডজ্ঞান নিশ্চয়ই আছে এতদিন জনাব জি কে শামীম কীভাবে হাসপাতালে ছিলেন। আগেই উল্লেখ করা রিপোর্টের একটা অংশ এই প্রসঙ্গে কোট করছি–কারা অধিদফতরের একটি সূত্র বলছে, জি কে শামীমকে হাসপাতালে পাঠাতে ‘উচ্চপর্যায়ের’ তদবির ছিল। এখনও তাকে আরাম-আয়েশে হাসপাতালে রাখার জন্য প্রভাবশালীদের অনুরোধ রয়েছে।

একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল তথাকথিত শুদ্ধি অভিযানে আটক আরেকজন মানুষের ক্ষেত্রে। চিকিৎসার জন্য কারাগার থেকে এসে প্রায় এক বছর হাসপাতালে ছিলেন ক্যাসিনোকাণ্ডে গ্রেফতার হওয়া যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী ওরফে সম্রাট। এই ব্যক্তির ক্ষেত্রেও একই ধরনের রিপোর্ট প্রকাশিত হবার পর ৭ অক্টোবর তাকে হাসপাতাল থেকে আবার কারাগারে পাঠানো হয়। 

বিরাট শোরগোল পাকিয়ে, জোরেশোরে হাঁকডাক দিয়ে, যে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছিল, সেটার সমাপ্তি ঘটলো ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনগুলোর তৃতীয়/চতুর্থ সারির হাতে গোনা কয়েক জনের শত কোটি টাকার দুর্নীতি দিয়ে। শোনা গিয়েছিল, যত বড় নেতাই হোক না কেন, যত ক্ষমতাই থাকুক না কেন কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেলো বড় নেতা দূরেই থাকুক, এমনকি অঙ্গ সংগঠনগুলোর প্রধানকেও জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়নি। আর যে হাতে গোনা কয়েকজনকে ‘আইওয়াশ’ হিসেবে গ্রেফতার করা হয়েছে, দেখা যাচ্ছে তারাও আছে বহাল তবিয়তে। 

বেশ শোরগোল পড়ে যাওয়ায় আপাতত আলোচিত এই দুই ব্যক্তিকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু আমি নিশ্চিতভাবেই জানি এরা যদি জামিনে মুক্তি পেয়ে না যান তাহলে আবারও হাসপাতালে আসবেন। আবারও মাসের পর মাস হাসপাতালের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কেবিনে আরাম-আয়েশে থাকবেন। তারপর আবার কোনও রিপোর্ট হয়তো তাদের আয়েশে থাকায় বাদ সাধবে, কারাগারে ফিরে যেতে হবে তাদের। তারপর কিছুদিন পর আবার...একই চক্র। 

এইমাত্র যা লিখলাম তাকে কি অতি কল্পনা বলে মনে হলো? তাহলে একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। তখনও দেশে মাদক এখনকার মতো ছড়িয়ে পড়েনি। ২০০৭ সালে বাসায় প্রায় দেড় লাখ ইয়াবা আর রীতিমতো ইয়াবা বানানোর কারখানা সহ গ্রেফতার হন আমীন হুদা। ২০১২ সালে নিম্ন আদালত তাকে ৭৯ বছর কারাদণ্ড দেন। তিনি জামিনে থাকলেও ২০১৩ সালে হাইকোর্টে তার জামিন বাতিল হয়। এরপর থেকে ২০২০ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি কারা-অন্তরীন ছিলেন। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—এই ৭ বছর সময়ের মধ্যে তিন বছরই তিনি ছিলেন হাসপাতালে। একটু আগে যা বললাম, ঠিক সেভাবেই। কোনও পত্রিকায় কঠিন রিপোর্ট ছাপা হলে কারাগারে যেতেন, তারপর আবহাওয়া ‘ঠান্ডা’ হলে আবার ফিরে আসতেন হাসপাতালে। 

এই রাষ্ট্র এখন অপরাধের স্বর্গরাজ্য। প্রতিটি দিন ঘটে অসংখ্য অপরাধ। এর মধ্যে অনেক কিছু নিয়ে শোরগোল হয়; সেসব নিয়ে সরকারকে কথা বলতে হয়। তখন আমাদের সামনে আসে ‘আইনের শাসন’ শব্দযুগল। অনুমান করি, ক্ষমতাসীন দলের প্রায় এক যুগের শাসনামলে উচ্চারণের সংখ্যায় ‘উন্নয়ন’, ‘স্বাধীনতার চেতনা’ এর পরেই হবে ‘আইনের শাসন’-এর অবস্থান। প্রতিদিন নানা ঘটনা ঘটে আর এই দেশের মানুষজন দেখে ‘আইনের শাসন’ কথাটি কত বড় এক মিথ্যাচার। 

এমন এক দেশে আমরা বাস করি যেখানে এই দেশের একজন সাধারণ নাগরিক তার জরুরি অসুস্থতায় পাবলিক/রাষ্ট্রীয় (সরকারি নয়) হাসপাতালের মেঝেতেও জায়গা পায় না, কিন্তু তাদের করের টাকায় চলা সে হাসপাতালেরই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কেবিনের ভেতরে আরাম-আয়েশে থাকে ভয়ংকর অপরাধীরা। এসব ঘটনার ঘনঘটার মধ্যেই আমাদের আবারও অসংখ্যবার হবে ‘শুদ্ধি অভিযান’ আর ‘আইনের শাসন’ শব্দগুলোর নির্লজ্জ উচ্চারণ।  

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ