X
শুক্রবার, ২৬ জুলাই ২০২৪
১০ শ্রাবণ ১৪৩১

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন: মহাকবির মহাকাব্য

সালেক উদ্দিন
১০ জানুয়ারি ২০২৩, ১৮:৩৮আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২৩, ১৯:২১

‘রক্ত দিয়ে হলেও আমি বাঙালি জাতির এই ভালোবাসার ঋণ শোধ করে যাবো’– বলেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। স্বাধীনতার মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমান ২৯০ দিন কারাভোগের পর পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডন ও নয়াদিল্লি হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) লাখো মানুষের সমাবেশে এই  ঘোষণা দিয়েছিলেন। এই বাণীটি ছিল বাংলাদেশের মানুষের জন্য বঙ্গবন্ধুর ত্যাগ ও ভালোবাসার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।

দিনটি ছিল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিন। বাঙালি জাতির স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা, স্বাধীনতার মহানায়ক সর্বোপরি জাতির পিতার স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসার দিবস। এই দিবসটি  মনে করিয়ে দেয় এ দেশের রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রাম ও ত্যাগের কথা। বঙ্গবন্ধু জন্মেছিলেন বলেই পরাধীন পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন বাংলাদেশ হয়েছে, সেই কথা। সেই ছাত্র রাজনীতি থেকেই আজকের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রতি পদক্ষেপেই তাঁর যেসব অবদান ছিল সেই কথা। মনে করিয়ে দেয় ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের জনগোষ্ঠীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে  আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবের ভূমিকার কথা। মনে করিয়ে দেয় জনগণের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি যে ৬ দফা দাবি প্রণয়ন করেছিলেন, যা পরবর্তীতে রূপ নিয়েছিল এক দফায়। আর তা হলো  স্বাধীনতা– বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সেই কথা। মনে করিয়ে দেয় ১৯৬৮ সালের আগরতলা মামলাসহ বহু ঘাত প্রতিঘাত পার হয়ে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করা সত্ত্বেও তাকে সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়নি, সেই কথা। মনে করিয়ে দেয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাঙালির ওপর অন্যায় অবিচারের যে প্রহসন চালিয়েছিল সেই কথা। মনে করিয়ে দেয় বাঙালির ওপর বৈষম্যবাদের চরম নির্যাতনের কথা।

এই বৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বরাবরই সোচ্চার ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তবে তিনি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন বলে ১৯৭১-এর মার্চ মাসের প্রথম দিন তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের বৈঠক অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করলে মার্চের ৩ তারিখে বঙ্গবন্ধু  দেশব্যাপী হরতাল ডাকেন। তাঁর  ডাকে তখন পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে চলে সংগ্রামের উত্তাল তরঙ্গ।  রাজপথে  বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিতে দ্বিধা করছিলেন না এদেশের সংগ্রামী জনতা। এমন একটি সময়ে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার তৎকালীন  রেসকোর্স ময়দানের বিশাল জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন,  ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। এই উক্তির ভেতর দিয়েই মূলত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা তথা স্বাধীনতার ঘোষণা বিবৃত হয়ে যায়। তারপরও তিনি চেয়েছিলেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কাছে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করুক। সে উদ্দেশ্যেই বঙ্গবন্ধু ২৪ মার্চ পর্যন্ত ইয়াহিয়া ও  ভুট্টোর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যান। এরপর আসে ২৫ মার্চের কাল রাত। সে রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। তারা ২৫ মার্চ মধ্যরাত থেকে মানব ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম গণহত্যা শুরু করে। সে রাতেই বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুকে তার ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় পাকবাহিনী। শুরু হয় স্বাধীনতা যুদ্ধ। সাড়ে সাত কোটি বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ।

৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের ফয়সালাবাদ বন্দিশালায় ব্রিগেডিয়ার রহিম উদ্দিন খানের সামরিক আদালত বঙ্গবন্ধুর গোপন বিচার শুরু হয় এবং সেই প্রহসনমূলক বিচারে তাঁকে ‘দেশদ্রোহী’ ঘোষণা করে মৃত্যুদণ্ড দেয় পাকিস্তানের সামরিক আদালত।

মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস কারাগারে তিনি অসহনীয় নির্যাতনের শিকার হন। শত নির্যাতনের পরও তিনি ছিলেন অটল। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও বাংলার জয়গান গেয়ে গেছেন তিনি। বুক উঁচিয়ে বলেছেন, ‘আমাকে তোমরা যদি ফাঁসিও দাও তবে আমার সেই নিথর শরীর বাংলার মাটিতে পাঠিয়ে দিও’।

দীর্ঘ নয় মাসের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে আপামর বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর কাছে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করলেও বাঙালির কাছে সেই স্বাধীনতা ছিল অসম্পূর্ণ। সেই অসম্পূর্ণতা ছিল বঙ্গবন্ধু ছাড়া স্বাধীন বাংলাদেশ– যেন মাঝনদীতে হাল ছাড়া এক নৌকা। বঙ্গবন্ধুকে স্বদেশে ফিরিয়ে আনার দৃঢ় প্রত্যয় ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের বীর বাঙালিদের। ২৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানাতে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে বিশ্বনেতারাও সোচ্চার হয়ে ওঠেন। পরাজিত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আন্তর্জাতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে শেষ পর্যন্ত বন্দিদশা থেকে বঙ্গবন্ধুকে সসম্মানে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

পাকিস্তানের নতুন সরকার প্রধান প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেওয়ার ঘোষণা দেন ৮ জানুয়ারি ১৯৭২। মুক্তি পেয়ে লন্ডন ও নয়াদিল্লি হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরেন বঙ্গবন্ধু।

বাঙালি ফিরে পায় জাতির পিতা। পরিপূর্ণতা লাভ করে বাংলাদেশে স্বাধীনতা। হানাদারমুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশে  বঙ্গবন্ধু প্রত্যাবর্তন করেন ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি । সেদিন সাড়ে সাত কোটি  মানুষের  ভালোবাসায় একাকার হয়ে যায় বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ যেন এক মহাকবির মহাকাব্য।আর সেই মহাকাব্যের সারকথা ছিল ‘রক্ত দিয়ে হলেও আমি বাঙালি জাতির এই ভালোবাসার ঋণ শোধ করে যাবো।’

লেখক: কথাসাহিত্যিক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
অনতিবিলম্বে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দিতে হবে: সাধারণ শিক্ষার্থী মঞ্চ
অনতিবিলম্বে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দিতে হবে: সাধারণ শিক্ষার্থী মঞ্চ
অলিম্পিকে ৪০ বছরে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স যেমন ছিল
অলিম্পিকে ৪০ বছরে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স যেমন ছিল
জুমার নামাজ ঘিরে বাড়তি সতর্কতা
জুমার নামাজ ঘিরে বাড়তি সতর্কতা
এক দফা আন্দোলন সফলের আহ্বান ছাত্রদলের
এক দফা আন্দোলন সফলের আহ্বান ছাত্রদলের
সর্বশেষসর্বাধিক