পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি বদলে দিয়েছে পুতিনের নির্দেশ

বিদেশ ডেস্ক
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১৫:২০আপডেট : ০১ মার্চ ২০২২, ১৫:৪৩

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন রবিবার দেশটির পারমাণবিক বাহিনীকে ‘সর্বোচ্চ সতর্ক’ থাকার নির্দেশ দিয়ে ‘প্রস্তুত’ থাকতে বলেছেন। তার এই নির্দেশ থেকে ইউক্রেন যুদ্ধকে বৃহত্তর পারমাণবিক সংঘাতে পরিণত করার ইঙ্গিত থাকতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। এর  ফলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকেও যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বাহিনীর সতর্কতার মাত্রা বাড়ানো হবে কিনা, সেই প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে।

রবিবারের এই ঘটনা এক বছরেরও কম সময় আগে দুই নেতার অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ওই সময় জেনেভায় সম্মেলনের পর পুতিন ও বাইডেন এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, ‘পারমাণবিক হুমকি শীতল যুদ্ধের সময়কার বিষয়। পারমাণবিক যুদ্ধে জয়ী হওয়া যায় না, এমন যুদ্ধ কখনও হওয়া উচিত না।’

রবিবার পুতিন রাশিয়ার শীর্ষ প্রতিরক্ষা ও সামরিক কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন পারমাণবিক বাহিনীকে ‘বিশেষ যুদ্ধকালীন দায়িত্বের জন্য’ প্রস্তুতি রাখতে। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে এটি স্পষ্ট নয়, এতে করে পারমাণবিক বাহিনীতে কী পরিবর্তন আসবে। যদি পরিবর্তন ঘটে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের মতো রাশিয়ারও আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সব সময় প্রস্তুত রাখা হবে। মনে করা হচ্ছে, রাশিয়ার সাবমেরিনভিত্তিক পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রও এর আওতায় থাকবে। যেমনটি করে থাকে যুক্তরাষ্ট্র।

পুতিন ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার পাল্টা পদক্ষেপ নিচ্ছেন। এসব নিষেধাজ্ঞাকে তিনি ‘আমাদের দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসী অবস্থান’ হিসেবে উল্লেখ করলেও বিস্তৃত ব্যাখ্যা দেননি।

বাইডেন প্রশাসনের পুতিনের পদক্ষেপ পর্যালোচনা করছে। তারা বলছে, ইতোমধ্যে বিপজ্জনক হয়ে পড়া সংঘাতকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে অপ্রয়োজনীয়ভাবে। পুতিনের কথায় যে হুমকির সুর ছিল তা শীতল যুদ্ধের সময়েও বিরল। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বকে পারমাণবিক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করার হুমকি দিত।

এতে কীভাবে বদলাচ্ছে পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকি?

পুতিনের বক্তব্যে ক্ষুব্ধ মার্কিন কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, তারা জানেন না, পুতিন কী চাইছেন। কিন্তু আমেরিকান বা রাশিয়ান নেতার পক্ষ থেকে পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকি দেওয়ার ঘটনা খুব বিরল, বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের পরিস্থিতিতে পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না বলে অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো রাশিয়াতেও একটি পারমাণবিক হামলার নির্দেশ দেওয়ার এখতিয়ার শুধু প্রেসিডেন্টের রয়েছে।  

এখন পর্যন্ত বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক অস্ত্রের মজুত রয়েছে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের। এগুলোর মধ্যে রয়েছে উড়োজাহাজ ও সাবমেরিনের বহনযোগ্য এবং ভূমিভিত্তিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। ইতিহাসে মাত্র একবার পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৫ সালে জাপানে দুটি বোমা ফেলে যুক্তরাষ্ট্র। সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৪৯ সালে তাদের প্রথম পারমাণবিক বোমার সফল পরীক্ষা চালায়।

আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী পরিচালক ড্যারিল কিম্বাল বলেন, পারমাণবিক বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে পুতিন যে নির্দেশ দিয়েছে তা দুঃখজনক। কিন্তু ইউক্রেনে তাকে ঠেকানোর চেষ্টাকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে যেসব হুমকি দিয়েছেন তাতে এটি অবাক করার মতো বিষয় থাকছে না। ইউক্রেন যুদ্ধের এই পরিস্থিতিতে পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয় নিয়ে আসাটা খুব বিপজ্জনক। যুক্তরাষ্ট্র, প্রেসিডেন্ট বাইডেন ও ন্যাটোকে অবশ্যই চরম ধৈর্য্যের সঙ্গে কাজ করতে হবে এবং এমন পাল্টা কোনও জবাব দেওয়া উচিত হবে না। এই সংকটে এটি চরম বিপজ্জনক মুহূর্ত। নেতারা যেন পারমাণবিক যুদ্ধের কিনারা থেকে সরে আসেন সেজন্য আমাদের আহ্বান জানাতে হবে।

পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি বদলে দিয়েছে পুতিনের নির্দেশ

পারমাণবিক বাহিনীকে সতর্ক রাখার অর্থ কী?

যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক তত্ত্ব অনুসারে, অস্ত্রের সতর্কতার মাত্রা হলো হামলা ঠেকাতে তাদের মূল ভূমিকা। প্রধান বিষয় হলো, স্বল্প সময়ে পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত হওয়া যাতে করে পাল্টা হামলার আগেই শত্রুর হামলা ঠেকানো এবং অপূরণীয় ক্ষতির পাল্টা হামলার ঝুঁকি নেওয়া যাতে।

পাল্টা আরেকটি যুক্তি হলো, কোনও সংকটে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে (আইসিবিএম) সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখার অর্থ হলো মার্কিন প্রেসিডেন্টকে হামলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের মোতায়েন করা ৪০০টি আইসিবিএম সশস্ত্র থাকে সব সময়।

অনেক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ ক্ষেপণাস্ত্র থেকে পারমাণবিক ওয়ারহেড আলাদা করে আইসিবিএমগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন। কিন্তু একটি সংকটকালীন অবস্থায়, যেমনটি রবিবার পুতিন নির্দেশ দিয়েছেন; পুনরায় ক্ষেপণাস্ত্রকে অস্ত্রসজ্জিত করার সিদ্ধান্তে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে ভয়াবহ করে তুলতে পারে।

শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার অস্ত্র যে অনেক বেশি ছিল তা নয়, এগুলোকে সব সময় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হত। সাবেক মার্কিন জর্জ এইচ.ডব্লিউ. বুশ ১৯৯১ সালে ঐতিহাসিক পদক্ষেপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পারমাণবিক বোমাগুলোকে সতর্ক অবস্থা থেকে বের করে নিয়ে আসেন। যা ছিল পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধের বড় পদক্ষেপ। এরপর থেকেই সতর্ক অবস্থায় নেই এগুলো।

এখন পর্যন্ত পুতিনকে কী জবাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র?

বাইডেন প্রশাসন পুতিনের ঘোষণার পর কোনও পাল্টা পদক্ষেপ নিয়েছে বলে এখন পর্যন্ত ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। পুতিনের নির্দেশের বাস্তবিক অর্থই তাদের কাছে বোধগম্য হচ্ছে না। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এমন কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি যাতে পুতিন উদ্বেগজনক কোনও পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে প্রতীয়মান হয়েছে। যেমন- পারমাণবিক অস্ত্র লোড বা পারমাণবিক সাবমেরিনের বিমানবহরের একাংশ বা অতিরিক্ত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বোঝাই সাবমেরিন সাগরে পাঠানো।

 

কয়েক বছর ধরে কিছু মার্কিন কর্মকর্তা উদ্বিগ্ন ছিলেন যে, পুতিন যদি ইউরোপে কোনও যুদ্ধে পরাজয়ের মুখে থাকেন, তাহলে হয়ত তিনি ননস্ট্র্যাটেজিক পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে বসতে পারেন। হয়ত পুতিন ভাবতে পারেন, এতে করে তার চাওয়া মতোই সংঘাতের দ্রুত অবসান হবে।

কৌশলগত পারমাণবিক বাহিনীর পাশাপাশি পুতিনের অন্তত কয়েক হাজার তথাকথিত ননস্ট্র্যাটেজিক পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। যেমন- স্বল্প পাল্লার ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। এগুলোকে ননস্ট্র্যাটেজিক বলা হয় কারণ যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে এসব আঘাত করতে সক্ষম না। কিন্তু এসব অস্ত্রের আওতায় থাকা ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য এটি কোনও সুখবর নয়। ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রেরও এমন ২০০টি ননস্ট্র্যাটেজিক অস্ত্র রয়েছে।

এপি অবলম্বনে।

/এএ/
টাইমলাইন: ইউক্রেন সংকট
সম্পর্কিত
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
প্রতিনিধি পরিষদের ইরান যুদ্ধ-বিরোধী ভোটের প্রতিক্রিয়ায় মুখ খুললেন ট্রাম্প
মার্কিন যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর, চলছে ইসরায়েলি হামলা
সর্বশেষ খবর
ইকরার মৃত্যু: জামিন পেলেন অভিনেতা জাহের আলভীর মা
ইকরার মৃত্যু: জামিন পেলেন অভিনেতা জাহের আলভীর মা
কৃষিকে আধুনিক ও জলবায়ু-সহিষ্ণু করতে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা জরুরি: প্রধানমন্ত্রী
কৃষিকে আধুনিক ও জলবায়ু-সহিষ্ণু করতে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা জরুরি: প্রধানমন্ত্রী
শিক্ষা ক্যাডারে বড় পদায়ন, ৩১ শিক্ষককে বদলি
শিক্ষা ক্যাডারে বড় পদায়ন, ৩১ শিক্ষককে বদলি
খলিলুর রহমানকে মন্ত্রিসভার অভিনন্দন
খলিলুর রহমানকে মন্ত্রিসভার অভিনন্দন
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী