X
বুধবার, ১৭ জুলাই ২০২৪
১ শ্রাবণ ১৪৩১

ভারতের নির্বাচন: সাবধানী প্রতিক্রিয়া ঢাকার রাজনীতিকদের

সালমান তারেক শাকিল
০৫ জুন ২০২৪, ২১:৪৬আপডেট : ০৫ জুন ২০২৪, ২২:৩৯

২০১৯ সালে ভারতের ১৭তম লোকসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের জয় পাওয়ার পর অভিনন্দন জানিয়েছিল আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, গণফোরামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। এবার ১৮তম লোকসভা নির্বাচনেও জয় পেয়েছে এনডিএ জোট। তবে এবার বিজয়ীদের প্রতি ঢাকার রাজনীতিকদের অবস্থান অনেকটা মিশ্র। রাজনীতিকদের কেউ কেউ আবার মন্তব্য করতেও সাবধানী। তারা বলছেন, ভারতের নির্বাচন দেশটির নিজস্ব ও অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং জনগণের অধিকারের প্রশ্ন।

বুধবার (৫ জুন) বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে কোনও কোনও দলের নেতারা জানান, সবেমাত্র ভারতের নির্বাচন হয়েছে। এনডিএ জিতলেও নতুন সরকার গঠন হবে আরও কয়েক দিন পর। সেক্ষেত্রে নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানাতে পারে দেশের কয়েকটি দল। ২০১৪ ও ২০১৯ সালে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন দল অভিনন্দন জানালেও ব্যতিক্রম ছিল কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো।

জোটগতভাবে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট এবার ২৯৩ আসনে জয়ী হয়েছে। ২০১৯ সালে এনডিএ পেয়েছিল ৩৫৩ আসন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে জোটটি ৩৩৬টি আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছিল। দলগতভাবে ২০১৪ সালের নির্বাচনে ২৮২টি আসন পেয়েছিল বিজেপি। আর ২০১৯ সালে দলটি পেয়েছিল ৩০৩টি আসন। এবার ২৪০টি আসনে জিতেছে তারা। বুধবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ দেশটির প্রধান দুই রাজনৈতিক জোট এনডিএ ও ইন্ডিয়া জোট (ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টাল ইনক্লুসিভ অ্যালায়েন্স)-এর প্রতি অভিনন্দন জানিয়েছেন।

ভারতের নির্বাচনের ফলাফলের পর প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এছাড়া বিএনপির অন্যান্য নেতাও অনেকটাই হিসাবী। সরাসরি অভিনন্দন বা কোনও প্রত্যাশা-প্রাপ্তির বিষয়ে কেউ মন্তব্য করতে রাজি হননি। বিশেষ করে ২০১৯ সালের নির্বাচনে মোদির বিজয়ের পর ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিনন্দনবার্তা পাঠান দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এবার কী হবে, এ নিয়ে এখনও কোনও নেতা কিছু বলতে নারাজ।

“প্রতিবেশী দেশের নির্বাচনে এনডিএ’র বিজয় হলেও মূলত কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সাফল্য থেকে বিএনপির গ্রহণ করার মতো বাস্তবতা রয়েছে’ বলে দলটির  প্রভাবশালী দায়িত্বশীলদের কেউ কেউ মনে করছেন। তাদের পর্যবেক্ষণ, ‘চলতি বছরের শুরুতে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দলের প্রার্থীদের বিজয় এবং তার সঙ্গে দেশটির সরকারের ‘চরম বৈরী’ আচরণের মধ্যেও নির্বাচনি সাফল্য এসেছে। একইসঙ্গে ভারতেও সদ্য নির্বাচনে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র সাফল্য থেকেও বিএনপির গ্রহণ করার মতো ‘বিচক্ষণতা’ প্রয়োজন।”

পর্যবেক্ষণে দায়িত্বশীলরা এও উল্লেখ করেন, রাজনীতিতে বৈরিতার মধ্য দিয়েই সাফল্য আসে। এ বিষয়টি বিএনপির নেতৃত্ব ‘বিচক্ষণতার’ সঙ্গে বিবেচনা করতে সক্ষম হলে রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে ২০১৪ সালে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও মনে করেন অনেকে। যদিও স্বনামে বিএনপির কোনও নেতা এ প্রসঙ্গে কিছু বলতে চাননি।

জানতে চাইলে বুধবার দুপুরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভারতে তো মোটামুটি নির্বাচন হয়। আমাদের দেশে তো রাতে ভোট হয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের লোকেরাই নির্বাচন করে ফেলে। আমাদের দেশে নির্বাচন করে ওসি-ডিসিরা। ভারতে জনগণ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছে, কিন্তু আমাদের এখানে তো ভোটই নাই।’

ভারতের নির্বাচন নিয়ে কথা বলেছেন বিএনপির মহাসচিব। বুধবার একটি অনুষ্ঠানে তিনি মন্তব্য করেন, ‘ভারতে ভোটের অধিকার আছে বলেই লোকসভা নির্বাচনে তার প্রতিফলন’ হয়েছে। ভারতবর্ষে ভোটের অধিকার আছে বলেই তারা অন্তত এই যে মোদির (নরেন্দ্র মোদি) তিনবার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার যে ইচ্ছা-ভাবনা, সেটাকে তারা (জনগণ) রোধ করে দিয়েছে। আজকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা তারা পাচ্ছে না।’

প্রতিবেশী দেশের নির্বাচনের প্রভাব ঢাকার রাজনীতিতে কেমন প্রভাব ফেলতে পারে— এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপির বিদেশ বিষয়ক কমিটির প্রধান ও  স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আমি তো মনে করি না। ভারতের নির্বাচন তারা তাদের মতো করবে। আমরা তো অন্য দেশের বিষয়ে মাথা ঘামাই না। তাদের নির্বাচনে কে আসবে, না আসবে, তা আমাদের বিবেচ্য না; সেটা ওই দেশের বিষয়। তারা ভোটে নির্বাচন করবেন এটাই স্বাভাবিক। এটাই তাদের অধিকার। জনগণ তাদের অধিকার প্রয়োগ করেছেন।’

তবে বিএনপির বাইরে অন্যান্য রাজনৈতিক ও সংগঠনের কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, নির্বাচনে এনডিএ জোট ক্ষমতায় এলেও বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়া ইতিবাচক অবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এক্ষেত্রে কেউ কেউ ‘বিজেপির কট্টরপন্থা’ খানিকটা হলেও ব্যাকফুটে গেছে, বলে মনে করেন।

জানতে চাইলে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান বলেছেন, ‘ভারতে সুন্দর নির্বাচন হয়েছে। আমি তাদের ওয়েলকাম করি। আমাদের দেশে তো ধারাবাহিকভাবে নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা হয়েছে। ভারতে যারা সাম্প্রদায়িকতার জিগির তুলেছিল, আশার কথা হচ্ছে তারা পাত্তা পায়নি। এটা ভারতের নিজেদের নিজস্ব ব্যাপার, তবু এটা জনগণের রায়। জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে সক্ষম হয়েছে।’

গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম এই শীর্ষ নেতা মনে করেন, ‘ভারতের নির্বাচন থেকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শেখার আছে। আমরা আট কোটি ভোটার অথচ আমাদের এখানে সুষ্ঠু ভোট হয় না। নিজেদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে গিয়ে ভোট করি না। কিন্তু ভারতে ভোট হয়েছে, সেখানে তো প্রায় ৯৭ কোটি ভোটার। এজন্য ভারতের জনগণকে ধন্যবাদ জানাই।’

ভারতের জনগণের রায়কে ইতিবাচক হিসেবে দেখেন এবি পার্টির সদস্য সচিব মজিবুর রহমান মনজু। তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছে বিজেপি বা নরেন্দ্র মোদি যদি ভোটের আগে নানান অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ ও ভয়ভীতি না দেখাতো—তাহলে ভোটের ফলাফলে তাদের অবস্থা আরও শোচনীয় হতো।’

“বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে ‘মোদি নীতি’র লজ্জার যে বহিঃপ্রকাশ ভারত সরকার দেখিয়েছে—তাতে এ দেশের জনগণ মোদির এই জনসমর্থন হ্রাসকে আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করছেন বলে মনে হচ্ছে”- দাবি করেন মজিবুর রহমান মনজু।

‘এবার মোদির দল বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে’ বলে মন্তব্য করে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটা স্বস্তির বিষয় যে আগের মতো একক আধিপত্য ভোগ করতে পারবে না বিজেপি। এর ফলে মোদির উগ্র মুসলিমবিদ্বেষী হিন্দুত্ববাদী নীতি কিছুটা ব্যাকফুটে চলে যাবে বলে আমার ধারণা।’

আজিজুল হক ইসলামাবাদীর ভাষ্য—‘সাধারণ জনগণের জীবনমানের বাস্তব উন্নয়ন না হলে নিছক ধর্মীয় বিভাজন ও ধনিক শ্রেণির তোষণ করে নিরঙ্কুশ জনসমর্থন ধরে রাখা যায় না। সে কারণেই নরেন্দ্র মোদির হাইপ এখন কমে গেছে ভারতে, যদিও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে জোটের বলে আবারও ক্ষমতায় আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ থেকে আমাদের ক্ষমতাসীনদেরও শিক্ষা নেওয়ার আছে।’

ধারণা করা হচ্ছে, আগামী ৮ জুন নতুন সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে শপথ নেবেন নরেন্দ্র মোদি। ২০১৪ ও ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত লোকসভা নির্বাচনে নতুন সরকার গঠনের পর নরেন্দ্র মোদিকে শুভেচ্ছাবার্তা জানিয়েছে জামায়াত। এবার দলটির পরিকল্পনায় কী রয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের সেক্রেটারি ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, ‘ভারতের নির্বাচনের ফলাফল বেরিয়েছে। সাধারণত প্রতিবেশী দেশ হিসেবে সরকার গঠনের পর দলীয়ভাবে অভিনন্দন পৌঁছানো হয়। এটা আসলে কার্টেসি। কে, কারা ক্ষমতায় এলো বা গেলো—সেটা বিবেচনা করে দেওয়া হয় না।’

বুধবার (৫ জুন) সন্ধ্যার পর বাংলা ট্রিবিউনকে মতিউর রহমান আকন্দ জানান, ভারতের নতুন সরকার গঠনের পর এ বিষয়ে (অভিনন্দনবার্তা) সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

প্রসঙ্গত, ভারতের বিগত দুটি নির্বাচনের পর ঢাকার ইসলামপন্থি দলগুলোর রাজনীতিকরা ক্ষমতাসীন বিজেপি নিয়ে নানা ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এবারও এর ব্যতিক্রম হচ্ছে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে কথা বলতে নানান মাধ্যমে যোগাযোগ করলেও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হকের সঙ্গে কথা বলা যায়নি।

/এপিএইচ/এমওএফ/
টাইমলাইন: লোকসভা নির্বাচন ২০২৪
০৫ জুন ২০২৪, ২১:৪৬
ভারতের নির্বাচন: সাবধানী প্রতিক্রিয়া ঢাকার রাজনীতিকদের
০৪ জুন ২০২৪, ২২:৫৫
সম্পর্কিত
পুলিশ স্টেশনে মায়ের গায়ে আগুন দিলো ছেলে
‘লাঠিপেটা করে আন্দোলন দমন করবেন ভাবলে বোকার স্বর্গে বাস করছেন’
দিল্লিতে বাংলাদেশ-ভারত কিডনি চক্রের পর্দাফাঁস হলো যেভাবে
সর্বশেষ খবর
ঢাবিতে গুলি ছোড়া যুবককে খুঁজে বের করবে পুলিশ
ঢাবিতে গুলি ছোড়া যুবককে খুঁজে বের করবে পুলিশ
শূন্য কার্যালয়ে মাঝরাতে নাটক করতেই ডিবির অভিযান: রিজভী
শূন্য কার্যালয়ে মাঝরাতে নাটক করতেই ডিবির অভিযান: রিজভী
বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ডিবি, শতাধিক ককটেল ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার
বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ডিবি, শতাধিক ককটেল ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার
রোকেয়া হল ছাত্রলীগের নেত্রীর কক্ষে হামলা, মারধর
রোকেয়া হল ছাত্রলীগের নেত্রীর কক্ষে হামলা, মারধর
সর্বাধিক পঠিত
মেট্রো স্টেশনে সংঘর্ষ!
মেট্রো স্টেশনে সংঘর্ষ!
সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা
সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা
ঢাবিতে ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগের হিড়িক
ঢাবিতে ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগের হিড়িক
ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগ করলেন আরেক নেতা, লিখলেন ‘আর পারলাম না’
ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগ করলেন আরেক নেতা, লিখলেন ‘আর পারলাম না’
কোটা আন্দোলনে কে এই অস্ত্রধারী!
কোটা আন্দোলনে কে এই অস্ত্রধারী!