মিরপুর থেকে সড়ক পথে উত্তরা যেতে হয় অনেক পথ ঘুরে, সেই সঙ্গে যাতায়াতে রয়েছে ভোগান্তি। এবার সেই দূরত্ব ও ভোগান্তি দুটোই কমিয়ে উত্তরা ও মিরপুরের বাসিন্দাদের জন্য স্বস্তি নিয়ে আসছে মেট্রোরেল। মাত্র ১৫ মিনিটেই মিরপুর থেকে উত্তরায় মেট্রোরেলে চড়ে সহজে আসা-যাওয়া করা যাবে। বর্তমানে সড়ক পথে যাতায়াতে যেখানে প্রায় এক ঘণ্টা বা তারচেয়েও বেশি সময় লেগে যায়।
বিশাল এই নির্মাণ প্রকল্পের উত্তরা-আগারগাঁও অংশের নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। আগামীকাল ২৮ ডিসেম্বর (বুধবার) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে মেট্রোরেল উদ্বোধন করবেন।
প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের কাজের পুরো সময়টাতেই মিরপুর ও উত্তরার লাখো বাসিন্দাকে চলাচল করতে হয়েছে মেট্রোরেলের নির্মাণকাজের ভোগান্তি সহ্য করেই। নির্মাণযজ্ঞ শেষে উদ্বোধনের দিন-ক্ষণ ঠিক হওয়ায় ওই এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে ফিরেছে স্বস্তি।
সম্প্রতি উত্তরা ও মিরপুরের বিভিন্ন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, মেট্রোরেল চালু হলে দুই এলাকার বাসিন্দাদের যাতায়াত সহজ হবে। একই সঙ্গে নানা সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে বলে মনে করছেন তারা। বিশেষ করে দুই এলাকার ব্যবসায়ীরা নিজেদের লাভটা বেশি দেখছেন।
কথা হয় উত্তরার বাসিন্দা মার্জিয়া হোসেন অপ্সরার সঙ্গে। মিরপুরের স্থায়ী বাসিন্দা না হলেও ছোটবেলা থেকেই সেখানে বসবাস তার। ছয় বছর আগে মেট্রোরেলের মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু হলে যাতায়াতে ভোগান্তি কমাতে তিনি মিরপুর ছেড়ে উত্তরায় তার অফিসের কাছাকাছি বাসা ভাড়া নিয়ে চলে যান। মেট্রোরেল চালুর খবরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তিনি বলেন, 'মিরপুরে অনেক স্মৃতি। স্কুল-কলেজ-বন্ধুবান্ধব সব মিরপুরে। কিন্তু চাকরির কারণে উত্তরা এসে থাকতে হচ্ছে। যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ থাকলে হয়তো উত্তরায় আসতাম না। এখন মেট্রোরেল চালু হচ্ছে। আবারও মিরপুরে চলে আসার চিন্তা আছে।'
মেট্রোরেল জীবনকে সহজ করবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, 'আমার পরিচিত অনেকেই মিরপুর থেকে উত্তরা এসে নিয়মিত অফিস করেন। প্রতিদিন পথে অনেক ভোগান্তিতে পড়েন তারা। আশা করছি মেট্রোরেল চালু হলে এই ভোগান্তি আর থাকবে না।'
শুধু যাতায়াত ভোগান্তি কমানোই না, মিরপুর আর উত্তরার মাঝে বিনোদন ও পর্যটনের সহজ উপায় তৈরি করবে মেট্রোরেল—মন্তব্য করে উত্তরা-১৩-এর বাসিন্দা আসিফ মাহমুদ বলেন, 'মিরপুরের কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে ক্রিকেট স্টেডিয়ামের কথা। স্টেডিয়ামে এসে খেলা দেখতে এখন আর দুইবার চিন্তা করতে হবে না। একেবারে স্টেডিয়াম গেটের সামনেই মেট্রোরেলের স্টেশন। মিরপুরে আরও কয়েকটি পর্যটন স্পট রয়েছে। চিড়িয়াখানা, বোটানিক্যাল গার্ডেন—এগুলাতে উত্তরা থেকে লোকজন যখন ইচ্ছা তখনই আসতে পারবেন।'
মেট্রোরেলে সুবিধা অনেক মন্তব্য করে উত্তরার আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ আরাফাত হোসেন বলেন, 'আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেলের যে সার্ভিস চালু হচ্ছে তাতে রাজধানীর যেকোনও স্থানে যাতায়াত উত্তরাবাসীর জন্য অনেক সহজ হবে। আগে এটুকু পথ উবারে যেতে কম করে হলেও ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা ভাড়া দিতে হতো। এখন অল্প খরচে ওইসব এলাকায় চলে যাওয়া যাবে। সময়ও বাঁচবে, ভোগান্তিও কমবে।'
মেট্রোরেলের কল্যাণে উত্তরাবাসীর জন্য যেমন মিরপুরের দুয়ার খোলা, তেমনি মিরপুরবাসীর জন্যও উত্তরা এখন নতুন সম্ভাবনা। নতুন বিনোদনের স্থান, বাসা ভাড়া, সহজ যাতায়াতসহ নানা সুবিধার কথা চিন্তা করছেন মিরপুরের বাসিন্দারা।
মিরপুরের বাসিন্দা মোহাম্মদ রাজিব বলেন, 'মেট্রোরেল চালু হলে আশা করছি কম সময়ের মধ্যে আব্দুল্লাহপুর পর্যন্ত যেতে আর কোনও ঝামেলা হবে না। আমার প্রায়ই ওইদিক যাওয়া-আসা করতে হয়। আত্মীয়-স্বজনও আসে। ইনশাআল্লাহ, আগের দুর্ভোগ এখন আর থাকবে না।'
সুলতানা মনি নামে মিরপুর বাংলা স্কুলের একজন শিক্ষার্থী মেট্রোরেল চালু হওয়া প্রসঙ্গে বলেন, এখন থেকে উত্তরার দিয়াবাড়ি গিয়ে কাশফুলের ছবি তোলা আর মিস হবে না। তিনি বলেন, 'ঘুরে বেড়ানোর জন্য উত্তরার দিয়াবাড়ি যে কারও পছন্দের জায়গা। অথচ মিরপুর থেকে ওখানে যেতে কত ঝামেলা পোহাতে হয়। এখন মেট্রোরেল সরাসরি দিয়াবাড়িতে গিয়ে থামবে। শুধু দিয়াবাড়ি না, উত্তরায় যাতায়াত সহজ হলে ওদিকের মানুষের সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়বে।'
মেট্রোরেল চালু হলে বিশেষ সুবিধা দেখছেন মিরপুরের ব্যবসায়ীরা। তাদের বিশ্বাস কম খরচে ভালো কেনাকাটা করতে উত্তরাবাসীর জন্য মিরপুর সবচেয়ে কাছে হবে। তাছাড়া উত্তরার চাইতে মিরপুরে কেনাকাটা সহজ ও সুবিধার বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
মিরপুর-১০ নম্বরের কাপড় ব্যবসায়ী আবদুল আজিজ বলেন, 'মেট্রোরেলের একটা স্টেশন মিরপুর-১০। এখন উত্তরা থেকে মানুষজন সরাসরি মিরপুরে এসে শপিং করবে। আমার বিশ্বাস—ভালো দামে ভালো জিনিস উত্তরার চেয়ে এখানে বেশি।'
মিরপুর-১২-এর আরেক ব্যবসায়ী মামুন বলেন, 'উত্তরা এখন ঘরের কাছে। যদিও মেট্রোরেলের সুবিধা পেতে আরও কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে দ্রুত অবস্থার পরিবর্তন হবে।'
ছবি: সাজ্জাদ হেসেন









