কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হওয়া চলমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তার জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। চলমান উত্তেজনার মধ্যেই মঙ্গলবার (১৬ জুলাই) বিকালে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে ছাত্রলীগ ও কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা। দুপক্ষের এই পাল্টাপাল্টি সমাবেশকে ঘিরে যদি কোনোরকম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় তাহলে পরিস্থিতি বুঝে ব্যবস্থা নেবে বলে পুলিশ।
পুলিশের একটি সূত্র বলছে, গতকাল সোমবার (১৫ জুলাই) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ দুপক্ষই শান্ত করার চেষ্টা করছে। নতুন করে এমন কোনও পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে বরাবরই মতোই তারা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
এ প্রসঙ্গে মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) লিটন কুমার সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনের শুরু থেকেই তাদের নিরাপত্তা দেওয়া জন্য আমরা পাশে ছিলাম। বরাবর মতোই এখনও আছি। গতকালও আমরা দুপক্ষকে শান্ত করার চেষ্টা করেছি। আজও যদি তারা নতুন করে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে আমরা ব্যবস্থা নেবো। পরিস্থিতি বুঝে আমরা ব্যবস্থা নেবো।
দুপুর ১টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন এলাকার সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে শিক্ষার্থীসহ লোকজনের আনাগোনা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। আশপাশে সব দোকানপাটও খুলতে দেখা যায়নি। পুলিশের চেকপোস্ট কিংবা তেমন কোনও টহলও চোখে পড়েনি। তবে দুপুরের পরপর খণ্ডখণ্ড মিছিল নিয়ে আসতে শুরু করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
কোটা আন্দোলনে শুরুতে কয়েকটি বিষয়ে দাবি জানালেও টানা কয়েক দিন ধরে এক দফা দাবি নিয়ে পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। সরকারি চাকরিতে সব গ্রেডে বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করে সংবিধানে উল্লিখিত অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য যে কোটা রয়েছে, সেটাকে ন্যূনতম মাত্রায় এনে সংসদে আইন পাস করার দাবি করছেন তারা।
এসবের মধ্যে গত রবিবার চীন সফর নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কোটা সংস্কার আন্দোলন প্রসঙ্গে করা এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এত ক্ষোভ কেন? মুক্তিযোদ্ধার নাতিপুতিরা কিছুই পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতিপুতিরা সব পাবে?’
প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা বা নাতিপুতি’ বলা হয়েছে অভিযোগ করে রবিবার রাত থেকে প্রতিবাদ শুরু করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। রাতে প্রথমে রোকেয়া হলের মেয়ে শিক্ষার্থীরা হল থেকে মিছিল নিয়ে বের হয়ে আসেন। তারা স্লোগান দেওয়া শুরু করেন ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’। এক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব হল থেকে ছেলে ও মেয়ে শিক্ষার্থীরা দলে দলে মিছিল নিয়ে টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের সামনে এসে বিক্ষোভ শুরু করেন। প্রায় দেড় ঘণ্টার বিক্ষোভ শেষে হলে ফিরে যান তারা।
একই সময়ে (রবিবার মধ্যরাতে) চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেন।
একই ইস্যুতে গতলাল সোমবার উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাবিসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়। দুপুরের দিকে ঢাবির রাজু ভাস্কর্যে এসে অবস্থান নেন কয়েকশ আন্দোলনকারী। এসময় তারা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহার চেয়ে নানা স্লোগান দেন। তবে তাদের ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’ স্লোগান নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আলাদা অনুষ্ঠানে তাদের স্লোগানের ভাষার তীব্র সমালোচনা করেন।
এরপর ক্যাম্পাসে সক্রিয় হয় ছাত্রলীগ। দুপুর ২টার দিকে তারা বিজয় ৭১ হলসহ বিভিন্ন হলে আন্দোলনকারীদের বাধা দেন। এ খবরে আন্দোলনকারীরা ছুটে গেলে ছাত্রলীগের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। উভয়পক্ষ ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। এরপর থেকে গোটা ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
বিকেল ৪টার পর থেকে পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকে। এসময় ছাত্রলীগ আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠি-সোটা নিয়ে আক্রমণ শুরু করে। আন্দোলনকারীদের অনেক কে পিটিয়ে আহত করে তারা। আন্দোলনকারীরা কোথাও কোথাও প্রতিরোধের চেষ্টা করে। ফলে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয়। বিকাল ৪টা থেকে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত চলা সংঘর্ষে শতাধিক আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী আহত হন। তাদের অধিকাংশই ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া আশপাশের অন্যান্য হাসপাতালেও গেছেন কেউ কেউ।
এদিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও বিকাল থেকে ছাত্রলীগ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সেখানে অনেকে আহত হন। এছাড়া সোমবার বিকেলে আন্দোলনে নামেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, কুমিল্লা ও খুলনাসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তারা বিভিন্ন স্থানে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করেন। আজ দুপুরের পর থেকে রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোড, মিরপুর রোড, সায়েন্সল্যাব, নতুন বাজার, বাড্ডা, মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় আন্দোলনকারীদের অবস্থান করার খবর পাওয়া গেছে।









