‘এত গভীরে আর কোনও সেতুতে পাইল বসেনি’

শফিকুল ইসলাম
২৪ জুন ২০২২, ১৫:০০আপডেট : ২৪ জুন ২০২২, ১৯:০০

প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েটের অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর সরাসরি ছাত্র। পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের পরিচালক (পিডি)। সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে তিনি সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের (সওজ) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালন করা অবস্থায় ২০১১ সালের নভেম্বরে এ প্রকল্পের দায়িত্ব পান। সেই থেকে যাত্রা শুরু। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, ২০১৩ সালে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর ২০১৩ সালের ১ ডিসেম্বর সরকার তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়। নানান চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তিনি সেই দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। যদিও সরকার পরবর্তী সময়ে আরও চারবার তার চুক্তির মেয়াদ বাড়িয়েছে। স্বপ্নের সেই সেতু আজ পরিপূর্ণ। এখন যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার অপেক্ষা। সেতুর দুই প্রান্তেই চলছে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন। একইসঙ্গে চলছে সেতুর সর্বশেষ টুকিটাকি কাজ। তাই প্রচণ্ড ব্যস্ত তিনি। এরমধ্যেই বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেছেন এই প্রকৌশলী। 

এই বিশাল অবকাঠামোর কাজ শেষ, চলছে মানুষের জন্য অবকাঠামো খুলে দেওয়ার প্রস্তুতি। এই অবকাঠামোর প্রধান কারিগর হিসেবে কেমন লাগছে জানতে চাইলে শুকরিয়া আদায় করে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পুরো একটা টিম নিয়ে বড় একটা কাজ শেষ করতে পারলাম। যেকোনও ছোট কাজ শেষ করতে পারলেই তো ভালো লাগে। সে ক্ষেত্রে পদ্মা সেতুর মতো একটা বড় কাজ শেষ করতে পরার সন্তুষ্টি তো বলে বোঝানো যাবে না। পুরো টিম সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞ।’

প্রকল্পের প্রায় শুরু থেকেই তো দায়িত্ব পালন করছেন, আছেন এখনও, কেমন লেগেছে জানতে চাইলে প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বলেন, কোনও প্রকল্পেই বারবার পিডি পরিবর্তন করা উচিত নয়। এতে প্রকল্পের কাজ ব্যাহত হয়। প্রকল্প সাফার করে। তাই সরকার একটা আইন করেছে, বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করা যাবে না। আইনটা কিন্তু সর্বত্র শতভাগ প্রয়োগ হচ্ছিল না। আমার বেলায় আইনটা প্রয়োগ হয়েছে। আমাকে প্রকল্পের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়নি সরকার। সরকার আমার ওপর আস্থা রেখেছে। এটি সরকারের একটা সুচিন্তিত মতামত। এ বিষয়ে আমার কোনও দ্বিমত নেই।’

বিভিন্ন মহলের কেউ কেউ তো প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে সমালোচনা করছেন, আপনি পিডি হিসেবে এই ব্যয়কে কেমন দৃষ্টিতে দেখছেন—এমন প্রশ্নে শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আগামী একশ’ বছরে কিন্তু আর একটা পদ্মা সেতু হবে না। পদ্মা সেতু কিন্তু শুধু একটা সেতু নয়, এটা ছয় লেনের সেতু। এর ওপর দিয়ে ট্রেন যাবে ১৬০ কিলোমিটার গতিতে। এটা ট্রান্সএশিয়ান রেলওয়েরও একটা অংশ।’ এই লোডটা সেতুর ওপর দিতে হয়েছে বলেও জানান তিনি।

পিডি বলেন, ‘আমাদের মূল পদ্মা সেতুর খরচ কিন্তু ১২ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এর বাইরেও নদী শাসন রয়েছে। আছে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন। আছে সেতুর দুই পাড়ে অ্যাপ্রোচ সড়ক। এ ছাড়া সেতুর ওপর দিয়ে বিদ্যুৎ লাইন ও গ্যাস লাইনও গেছে ওপারে। বিদ্যুৎ লাইন নিতে কিন্তু খরচ হয়ে যাচ্ছে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। সেতুর ওপর দিয়ে গ্যাস লাইন গেছে। এ কাজে ৩০০ কোটি টাকারও বেশি খরচ হচ্ছে; যা অনেকে বুঝতে পারে না। পুরো পদ্মা সেতুটি কিন্তু দ্বিতল সেতু। মেঘনা সেতু একটা, ভৈরব সেতু একটা। পদ্মা কিন্তু দুইটা সেতু। তিনি জানান, সেতুতে মোট ব্যয় হবে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। আমরা আশা করছি, ২০ থেকে ২৫ বছরেই এই টাকা উঠে আসবে।’

বিশ্বের অন্য যেকোনও সেতুর তুলনায় পদ্মা সেতুর রেকর্ড সম্পর্কে জানতে চাইলে ইঞ্জিনিয়ার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পানি প্রবাহের বিবেচনায় বিশ্বে আমাজন নদী শীর্ষে। দ্বিতীয় অবস্থানেই পদ্মা। এই নদীতে সেতু করতে গিয়ে মাটির ১২০ থেকে ১২৭ মিটার গভীরে পাইল বসানো হয়েছে। এত গভীরে পৃথিবীর আর কোনও সেতুর পাইল বসাতে হয়নি; যা বিশ্বে রেকর্ড। রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প সহায়ক করে নির্মিত হয়েছে পদ্মা সেতু। তাই ভূমিকম্পের বিয়ারিং প্রযুক্ত হচ্ছে এই সেতুর দ্বিতীয় রেকর্ড। পদ্মা সেতুতে ‘ফ্রিকশন পেন্ডুলাম বিয়ারিং’-এর সক্ষমতা ১০ হাজার টন। এখন পর্যন্ত পৃথিবীর অন্য কোনও সেতুতে এমন সক্ষমতার বিয়ারিং লাগানো হয়নি। সেতুর তৃতীয় বিশ্বরেকর্ড হলো, পদ্মা সেতুর পিলার এবং স্প্যানের মধ্যে যে বিয়ারিং থাকে সেটি। এখানে ১০ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন ওজনের একেকটি বিয়ারিং ব্যবহার করা হয়েছে। পৃথিবীতে এর আগে কোনও সেতুতে এমন বড় বিয়ারিং ব্যবহার করা হয়নি। এই সেতুর চতুর্থ রেকর্ড হলো নদীশাসন সংক্রান্ত। ১৪ কিলোমিটার (১ দশমিক ৬ কিলোমিটার মাওয়া প্রান্তে ও ১২ দশমিক ৪ কিলোমিটার জাজিরা প্রান্তে) এলাকা নদী শাসনের আওতায় আনা হয়েছে।’

পদ্মা সেতুতে ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রী সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পদ্মা সেতুতে দেশি-বিদেশি নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। একইসঙ্গে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বাংলাদেশের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানও কাজ করেছে।’

তিনি জানান, পদ্মা সেতুতে দেশি কোম্পানিও কাজ করেছে। পদ্মা সেতুতে আমাদের তিনটি বড় কন্ট্রাক্ট ছিল। একটা হচ্ছে মূল সেতু, একটা নদী শাসন ও অ্যাপ্রোচ সড়ক। মূল সেতুতে কাজ করার দায়িত্ব পেয়েছে চাইনিজ ঠিকাদার, নদীতে ড্রেজিংয়েও চাইনিজ ঠিকাদার সিনোহাইড্রো। অ্যাপ্রোচ সড়ক করেছে বাংলাদেশের আবদুল মোনেম লিমিটেড (এএমএল)। ওরা মালয়েশিয়ার একটা কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেছে। সক্ষমতার অভাবের কারণেই কিন্তু বিদেশি ঠিকাদার আনতে হয়েছে। সেতু প্রকল্পে সিমেন্ট, বালি বাংলাদেশের। কিন্তু সেতুতে যে পাথর ব্যবহার করা হয়েছে তা বাংলাদেশে নেই। প্রকল্পের জন্য ভারত থেকে বেশি পাথর আনা হয়েছে। তবে দুবাই থেকেও পাথর এনেছি। রেলের কিছু প্লেট চীন থেকে আমদানি করা হয়েছে কোয়ালিটি রাখতে গিয়ে। রেলওয়ের জন্য স্ট্রেনঞ্জার লুক্সেমবার্গ থেকে এসেছে।

/আইএ/এমওএফ/
টাইমলাইন: পদ্মা সেতু টাইমলাইন
২৬ জুন ২০২২, ১০:০০
২৫ জুন ২০২২, ১৩:১৮
২৫ জুন ২০২২, ১১:৫৯
সম্পর্কিত
১০ দিনে পদ্মা ও যমুনা সেতুতে টোল আদায় প্রায় ৬৪ কোটি টাকা
পদ্মা সেতু হয়ে শেষ দিনে স্বস্তির ঈদযাত্রা
ঈদযাত্রায় পদ্মা সেতুতে ৪৮ ঘণ্টায় টোল আদায় প্রায় ১০ কোটি টাকা
সর্বশেষ খবর
ফ্রিল্যান্সারদের আয় থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ কর কাটা নিয়ে যা বলছে এনবিআর 
ফ্রিল্যান্সারদের আয় থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ কর কাটা নিয়ে যা বলছে এনবিআর 
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
ভাতের সঙ্গে জমবে মজাদার সরষে সবজি
ভাতের সঙ্গে জমবে মজাদার সরষে সবজি
মার্কিন যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর, চলছে ইসরায়েলি হামলা
মার্কিন যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর, চলছে ইসরায়েলি হামলা
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী