কোটাবিরোধী আন্দোলন কয়েক দিন ধরে রাজধানীসহ সারা দেশকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। ২০১৮ সালে সব কোটা বাতিলে সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে সেই প্রজ্ঞাপন স্থগিত করে হাইকোর্ট। আবারও ‘সমাধান হওয়া’ বিষয় নিয়ে মাঠে নামতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের। বুধবার (১০ জুলাই) আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও অবরুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান হবে মনে করা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন রূপ নিয়েছে। আন্দোলনকারীরা ঘোষণা দিয়েছেন—এটি আদালতের এখতিয়ার নয়। এটি একমাত্র নির্বাহী বিভাগই পূরণ করতে পারবে। তাদের দাবি, সরকারের কাছ থেকেই সুস্পষ্ট বক্তব্য আসতে হবে।
এদিকে, আপিলে হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত হওয়ায় ‘কোটা বাতিলে’ সরকারের সিদ্ধান্ত বলবৎ হওয়ার পরেও কেন রাজপথ ছাড়বেন না শিক্ষার্থীরা সেই প্রশ্ন উঠছে। কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীরা এখন কোটা বাতিলের বিরোধিতা করে ‘যৌক্তিক সমাধান’ চান। কী সেই যৌক্তিক সমাধান। এ নিয়ে পাওয়া গেছে একাধিক মত।
বুধবার আপিলের আদেশের পর সর্বশেষ কী অবস্থা দাঁড়ালো জানাতে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, আপিল বিভাগ স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে বলেছেন। অর্থাৎ যেমন আছে, তেমন থাকবে। কোটা বাতিল-সংক্রান্ত ২০১৮ সালের পরিপত্রের ভিত্তিতে যেসব সার্কুলার দেওয়া হয়েছে, সে ক্ষেত্রে কোটা থাকছে না।
যৌক্তিক সমাধান মানে সংস্কারের দাবি কিনা, প্রশ্নে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী মেহরাব হোসেন বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও পরিবারের ৩০ শতাংশ কোটা যৌক্তিক নয়। সরকারি চাকরিতে সব গ্রেডে ‘অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক’ কোটা বাতিল করে এক দফা দাবি আদায়ে নেমেছি আমরা। কোনও বৈষম্য আমরা চাই না।’ তার পাশে দাঁড়ানো আরেক আন্দোলনকারী বলেন, ‘কোটা সংস্কার করতে হবে। আমরা সব মিলিয়ে ৫৬ শতাংশ কোটা না দিয়ে ‘যৌক্তিক’ পরিমাণ দেওয়ার পক্ষে।’ তাহলে কোটা বাতিল নাকি সংস্কার, জানতে চাইলে সদুত্তর দেননি তিনি।
আপিলের রায়ের পরে রাস্তা থেকে সরে যাওয়া উচিত ছিল উল্লেখ করে রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুভাষ সিংহ রায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আজকের আপিল বিভাগের আদেশের পরে রাস্তা না ছাড়ার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে আন্দোলনকারীরা নিজেদের চরিত্র প্রকাশ করে দিচ্ছে। তারা যেটাকে যৌক্তিক আন্দোলন বলছে, সেখানে অন্য এজেন্ডার লোকজন ঢুকে পড়েছে। তা না-হলে তাদের যে দাবি, সেই দাবি নিশ্চিত হওয়ার পরেও এখন সরকারের কাছ থেকে দাবি আদায়ের কথা বলা, কমিশনের দাবিগুলো খুব উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’
এর আগে মঙ্গলবার (৯ জুলাই) সচিবালয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, কোটা ইস্যুটিতে এখন আর সরকারের সিদ্ধান্তের ব্যাপার নেই, ইস্যু এখন সর্বোচ্চ আদালতের কাছে। সর্বোচ্চ আদালত সিদ্ধান্ত নেবে, সব পক্ষকে শুনে সব বিবেচনা করে সঠিক সিদ্ধান্ত দেবেন।’ আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে এই মামলায় পক্ষভুক্তির আবেদন করার বিষয়টিকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করেন। তিনি বলেন, ‘তারা তাদের বক্তব্য এখন আদালতে দেবেন। যেহেতু আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এখন তারা আন্দোলন তুলে নেবেন।’
এদিকে কোটা সংস্কার ও নারী কোটা থাকার গুরুত্ব উল্লেখ করে নারী আন্দোলনের নেত্রী রোকেয়া কবীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নারীদের কোটা দেওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। যারা এখন রাজপথে বলছেন—মেধার ভিত্তিতে আমলা নিতে হবে, তাদের পাল্টা প্রশ্ন করা দরকার, এখনও তাই তো নেওয়া হচ্ছে। আমি তো মনে করি, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও পরিবারের জন্য সম্মান দেখাতে হবে। কোটা ৩০ শতাংশ দেওয়ার দরকার নেই, সেটা কমিয়ে দেওয়ার সুযোগ আছে। বিশ্বের যেকোনও দেশের স্বাধীনতায় অবদান আছে যাদের, তাদের এটুকু সম্মান জানানো জরুরি।’
যদিও মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের পক্ষে এখনও দৃঢ় অবস্থানে কোটাবিরোধীরা। আদালতের রায়ের সঙ্গে আমাদের আন্দোলনের কোনও সম্পর্ক নেই উল্লেখ করে কোটাবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা চাই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কিছু কোটা থাকুক।’ সরকার ২০১৮ সালে যে পরিপত্র জারি করেছিল, সেটা ত্রুটিযুক্ত দাবি করে তিনি বলেন, ‘সেটা রয়ে গেলে বারবার কেউ না কেউ আদালতের শরণাপন্ন হয়ে বিষয়টাকে জিইয়ে রাখবে। আমরা একটা চূড়ান্ত সংস্কার চাই। আমাদের দাবি, সব গ্রেডে বৈষম্যমূলক কোটা বাদ দিয়ে সংস্কার করতে হবে। সেখানে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কিছু সংরক্ষণ থাকতে পারে।’
কত শতাংশ কোটা তারা দিতে চান প্রশ্নে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ কোটা রাখা যেতে পারে। সরকারকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে তা বাস্তবায়নের দিকে যেতে হবে।’
কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীরা মনে করেন, তারা কোনও অযৌক্তিক আন্দোলন করছেন না। সংবিধানে কোটা দেওয়ার কথা বলা নেই উল্লেখ করে তারা বলছে, সংবিধানের ২৮(৪) এবং ২৯(৩) ধারায় বলা হয়েছে—রাষ্ট্র মনে করলে অনগ্রসর জাতিকে কোটা দিতে পারে। তবে বাধ্য নয়। সংবিধানে সুযোগের সমতার কথা বলা হয়েছে। অন্যায় কোটা দিয়ে কাউকে সুযোগ দিলে আরেকজন বঞ্চিত হবে—এরকম কোনও নিয়মের উল্লেখ নেই।
প্রসঙ্গত, সংবিধানের ২৯(২) ধারায় বলা আছে—‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনও নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের অযোগ্য হবেন না। কিংবা সেই ক্ষেত্রে তার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাবে না।’ এছাড়া ২৮ ধারার ৪ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যেকোনও অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন করা যাবে।’









