X
বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
৯ ফাল্গুন ১৪৩০

২৮ অক্টোবর: কার লাভ কার ক্ষতি?

মাহফুজ সাদি ও জুবায়ের আহমেদ
৩১ অক্টোবর ২০২৩, ০০:০৭আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২৩, ০৬:৩০

রাজপথে ব্যাপক সংঘর্ষ-সহিংসতা ও পুলিশ সদস্য হত্যার জেরে পণ্ড হয় বিএনপির ২৮ অক্টোবরের মহাসমাবেশ। অপরদিকে একইদিনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমাবেশ শেষ হয় শান্তিপূর্ণভাবে। পরদিন ২৯ অক্টোবর হরতাল ডাকলেও রাজপথে দেখা যায়নি বিএনপিকে, শান্তি সমাবেশ করেছে আওয়ামী লীগ। হরতালে মাঠে না থাকলেও নতুন করে টানা তিনদিনের অবরোধ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে বিএনপি। অবশ্য সরকারি দলও মাঠে থেকে তা মোকাবিলার ঘোষণা দিয়েছে।

এ অবস্থায় ক্ষমতাসীন ও বিরোধীদের মধ্যে লাভ-ক্ষতির হিসাব কষা হচ্ছে। দুই দলই নিজেদেরকে উইন-উইন অবস্থানে দেখছে। সরকারি দল মনে করছে, ২৮ অক্টোবরের ঘটনায় তারা বিরোধীদের চাপে রাখার নতুন সুযোগ পেয়েছে। সহিংসতায় কারণে পশ্চিমাদের সমর্থনে কিছুটা হলেও ছেদ পড়বে। অপরদিকে বিরোধী দলের দাবি ওই ঘটনা তাদের কর্মীদের চাঙ্গা করেছে। বিরোধী দলের ‘গণতান্ত্রিক আন্দোলন’ সরকার দমন- করছে সেটার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

শান্তিপূর্ণভাবে শক্তি প্রদর্শন করে রাজপথ দখলে রাখা এবং সরকারবিরোধী আন্দোলন পণ্ড হয়ে যাওয়ায় চাঙাভাব দেখা যাচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে। দলটি এখন তফসিল ঘোষণার আগে বড় কোনও আন্দোলনের ঝুঁকি না দেখলেও শঙ্কামুক্ত হতে চাইছে। সে জন্য বিএনপির প্রতিটি কর্মসূচির দিন রাজপথে শান্তিপূর্ণভাবে সতর্ক অবস্থানে থাকার নির্দেশনা দিয়েছে আওয়ামী লীগ। বিরোধীরা যাতে নতুন করে আবার সংগঠিত হয়ে আর কোনও ডেটলাইনের ক্ষেত্র তৈরি হতে না পারে, সেজন্য টানা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকবে সরকারি দল।

আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, ২৮ অক্টোবর সরকার পতনে ডেটলাইন দিয়ে বিএনপি এক দফার আন্দোলন নিয়ে মাঠে নেমেছিল। পুলিশের সঙ্গে সংঘাত-সহিংসতায় জড়িয়ে দলটির সেই পরিকল্পনা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। বিশেষ করে প্রধান বিচারপতির বাসভবনে হামলা ও নির্মমভাবে পিটিয়ে পুলিশ সদস্যকে হত্যার ঘটনা বিরোধীদের চাপে ফেলেছে। হরতাল পালনের চিত্রে তাদের হতাশা স্পষ্ট হয়েছে। অবরোধেও তারা সুবিধা করতে পারবে না বলে সরকারি দল মনে করছে। ফলে ডেটলাইনের দিনের সার্বিক পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে চাঙাভাব এবং নির্বাচন পর্যন্ত বিরোধীদের মোকাবিলায় মনোবল তৈরি হয়েছে।

তারা মনে করছেন, দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সরকারের ওপর যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর অব্যাহত চাপ মোকাবিলা করা সরকারি দলের জন্য সহজ হবে। অন্যদিকে সংঘর্ষের ঘটনায় বিরোধী দল চাপের মুখে পড়বে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গ্রেফতার হয়েছেন, অন্য শীর্ষ নেতারা ফেঁসে যেতে পারেন এবং গ্রেফতার হতে পারেন। এতে আন্দোলনে নেতৃত্ব সংকটে পড়বে বিএনপির নেতাকর্মীরা আর সুবিধাজনক অবস্থানে থাকায় মনোবল বাড়বে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের একজন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ২৮ অক্টোবর বিএনপি পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগ সংঘাতে যায়নি। ফলে রাজনৈতিকভাবে এ ঘটনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে আওয়ামী লীগ আর চাপে পড়েছে বিএনপি। এখন পুলিশের মামলায় গ্রেফতার এড়াতে পালিয়ে বেড়াবে বিএনপি নেতারা। তারা নতুন করে আন্দোলন সংগঠিত করার সুযোগ পাবে না। সবমিলিয়ে ডেটলাইনের ঘটনায় লাভ হয়েছে আওয়ামী লীগের, ক্ষতি বিএনপির।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিএনপির ডেটলাইন, সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে। তাদের আন্দোলন পণ্ড হয়ে গেছে। বিএনপি নেতারা এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছে, নেতাকর্মীদের মাঝে হতাশা দেখা দিয়েছে। দেশের মানুষ এখন নির্বাচনমুখী। বিএনপি আবারও নির্বাচন বানচাল করতে ২০১৩, ১৪ ও ১৫ সালের মতো সন্ত্রাসী চরিত্রে ফিরে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে আমরাও তাদের মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত রয়েছি।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ২৮ অক্টোবরের সংঘর্ষ ও সহিংসতার ছবি-ভিডিও ও সংবাদ একসঙ্গে করে বাংলাদেশে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের দূতাবাস, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশের দূতাবাসে পাঠাচ্ছে সরকার। সোমবার (৩০ অক্টোবর) বিকালে ঢাকায় নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকদের ২৮ অক্টোবরের ঘটনা নিয়ে ব্রিফ করার পাশাপাশি বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী সূচনা বক্তব্যে বলেন, যা যা ঘটেছে, বিশেষ করে ২৮ অক্টোবর বিএনপি ও জামায়াতের বিভিন্ন সন্ত্রাসী হামলা, জ্বালাও-পোড়াও, প্রধান বিচারপতির বাসভবনে আক্রমণ এবং গেট ভেঙে ভেতরে ঢোকা, পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য যারা দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত ছিলেন, তাদের যেভাবে মেরেছে, সেগুলো আপনাদের (গণমাধ্যমের) মাধ্যমে পাওয়া।

‘বিভিন্ন ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ও ছবি যা সবার কাছে আছে, সেগুলো কূটনীতিকদের দেখানো হয়েছে এবং তাদের অভিব্যক্তি থেকে এটুকু বলতে পারি যে, তারা স্তব্ধ হয়ে গেছেন’ বলে জানান প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর একজন প্রভাবশালী সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সরকারিভাবে বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের জানানোর পাশাপাশি দলীয়ভাবেও আমরা বিএনপির সহিংসতার তথ্য-প্রমাণ কূটনীতিকদের কাছে পাঠানোর চিন্তা করছি। আমাদের পাঠানো এসব তথ্য-প্রমাণ তাদের যাচাই-বাছাই করে দেখার অনুরোধ জানানো হবে। এর ফলে বিএনপি কূটনৈতিকভাবেও সহিংসতার জন্য চাপে পড়বে বলে আমরা মনে করি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, বিএনপি শান্তিপূর্ণ মহাসমাবেশের কথা বলে ঢাকায় এসে পুলিশের ওপর হামলা করেছে, জ্বালাও-পোড়াও হয়েছে। তারা ফৌজদারি অপরাধ করেছে। তাদের নামে মামলা হয়েছে। বিএনপি মহাসচিব গ্রেফতার হয়েছেন। সহিংসতার নির্দেশদাতা, মদতদাতা অন্য নেতাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। বিদেশিরা সহিংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চার। সেটি বিএনপি করায় তারা চাপে পড়বে। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তারা ব্লেম দিলেও আমাদের সমাবেশ শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। আমাদের নেতাকর্মীরা আগের চেয়ে আরও চাঙা হয়েছে, মনোবল বৃদ্ধি পেয়েছি।

আওয়ামী লীগের নেতারা বলেছেন, তাদের নেতাকর্মীদের তফসিল ঘোষণা পর্যন্ত সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন পর্যন্ত নেতাকর্মীরা মাঠে থাকবে। ফলে রাজপথে থাকছে আওয়ামী লীগ। কিন্তু এক মহাসমাবেশেই সহিংসতা করে পণ্ড হয়ে গেছে বিএনপির আন্দোলন। তারা সচিবালয় ও নির্বাচন কমিশন ঘেরাও করার মতো কর্মসূচি দেওয়ার পরিকল্পনা করলেও সব ভেস্তে গেছে। হরতাল দিয়েও মাঠে মানতে পারেনি, অবরোধেও পারবে না।

আওয়ামী লীগের কূটনৈতিক বিষয়াদি দেখভালের দায়িত্বে থাকা একজন নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এতদিন বিএনপি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করে আসায় রাজপথে সরব থাকতে পেরেছে। বিদেশি কূটনীতিকরাও তাদের সাধুবাদ জানিয়েছে। ২৮ অক্টোবর সহিংসতায় জড়িয়ে তারা এখন বেকায়দায় পড়েছে। বিদেশিরা সহিংসতার নিন্দা জানাচ্ছে। রাজপথে টিকতে না পেরে ছিটকে পড়েছে বিএনপি।

২৮ অক্টোবর ঢাকায় রাজনৈতিক সমাবেশ চলাকালে সহিংসতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও নরওয়ের কূটনৈতিক মিশন। ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের ফেসবুক একাউন্টে সোমবার ‘জয়েন্ট স্টেটমেন্ট ফ্রম ডিপ্লোম্যাটিক মিশনস’ শীর্ষক এ বিবৃতিতে বলা হয়, সহিংসতায় যারা প্রাণ হারিয়েছেন বা আহত হয়েছেন তাদের প্রতি আমাদের সহমর্মিতা। সব অংশীদারের প্রতি আমরা সহিংসতা থেকে বিরত থাকতে ও সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানাই। একই সঙ্গে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানাই।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাংলাদেশ দূতাবাস তাদের টুইটে লিখেছে, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং এর সদস্য রাষ্ট্রগুলো ঢাকার রাজপথে সহিংসতায় প্রাণহানির বিষয়টি দেখে গভীরভাবে মর্মাহত। অংশগ্রহণমূলক এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য একটি শান্তিপূর্ণ পথ খুঁজে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।’

শনিবারের রাজনৈতিক সহিংসতার প্রতিক্রিয়ায় ভয়েস অব আমেরিকাকে পাঠানো এক বার্তায় মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ডোনাল্ড লু বলেছেন, সম্ভাব্য ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সব সহিংসতার ঘটনা পর্যালোচনা করবে। বার্তায় সব পক্ষকে শান্ত থাকার ও সংযম দেখানোর আহ্বান জানানো হয়।

ডোনাল্ড লু বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশে সংঘটিত রাজনৈতিক সহিংস ঘটনার নিন্দা জানাচ্ছে। একজন পুলিশ অফিসার ও একজন রাজনৈতিক কর্মীর নিহত হওয়া এবং একটি হাসপাতালে আগুন দেওয়ার যে ঘটনাগুলোর খবর জানা গেছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। সাংবাদিকসহ নাগরিকদের ওপর চালানো সহিংসতাও গ্রহণযোগ্য নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন। ডোনাল্ড লু বলেন, ‘সম্ভাব্য ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সহিংসতার সব ঘটনাকে পর্যালোচনা করবে।’

ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস থেকেও এক বিবৃতিতে রাজনৈতিক সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে সবাইকে সংযত আচরণ করার আহ্বান জানানো হয়। ঢাকায় রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে কড়া বার্তা দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। শ‌নিবার (২৮ অক্টোবর) ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের ফেসবুক পেজে এক বিবৃতিতে এ নিন্দা জানানো হয়। দূতাবাসের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘২৮ অক্টোবর ঢাকায় যে রাজনৈতিক সহিংসতা সংঘটিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র তার নিন্দা জানায়। একজন পুলিশ কর্মকর্তা, একজন রাজনৈতিক কর্মী হত্যা এবং একটি হাসপাতাল পোড়ানোর ঘটনা অগ্রহণযোগ্য। সাংবাদিকসহ বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতাও তেমনই। সম্ভাব্য ভিসা নিষেধাজ্ঞার জন্য আমরা সব সহিংস ঘটনা পর্যালোচনা করবো। আমার সব পক্ষকে শান্তি ও সংযমের আহ্বান জানাই।’

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা দেশগুলো অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসলেও যেকোনও ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে রয়েছে। এতদিন বিএনপি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করে আসায় ধারাবাহিকভাবে কর্মসূচি পালন করতে পেরেছে। পুলিশও তাতে বাধা দেয়নি। এবার ২৮ অক্টোবর সহিংসতার কারণে বিএনপির আন্দোলন পণ্ড হয়েছে।

শনিবার বিএনপি-পুলিশের সংঘর্ষের পরে দলটির নয়াপল্টনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কথিত উপদেষ্টা মিয়া জাহিদুল ইসলাম আরেফী ওরফে মিয়া আরেফীকে সংবাদ সম্মেলন করে। ওই ব্যক্তি বাংলাদেশ পুলিশ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন ও বিচার বিভাগের উপর নিষেধাজ্ঞা দিতে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের কাছে সুপারিশ করবেন বলে দাবি করেন। জানা গেছে, বিএনপির আন্তর্জাতিক কমিটির সদস্য ইশরাক হোসেনের সঙ্গে মিয়া আরেফী নয়া পল্টনে সংবাদ সম্মেলন করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টার পরিচয়ে দেশটির নাগরিকের এমন কর্মকাণ্ড নিয়ে শনিবার রাতেই বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের সঙ্গে কথা বলেন আওয়ামী লীগের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। ওই নেতা মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কাছে মিয়া আরেফীর বিষয়ে জানতে চান। পরে মার্কিন দূতাবাস থেকে বলা হয়, ‘ওই ভদ্রলোক যুক্তরাষ্ট্র সরকারের হয়ে কথা বলেন না। তিনি একজন বেসরকারি ব্যক্তি।’ এরপর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিবৃতি দিয়ে বলেন, বিষয়টি তারা অবগত নয়। পরে অবশ্য ওই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং তাদের কাছে তিনি স্বীকার করে তাকে শিখিয়ে ওই সংবাদ সম্মেলনে আনা হয়েছে। তিনি বিষয়টি অবগত ছিলেন না। তারা যেভাবে শিখিয়ে দিয়েছে সেটিই বলেছেন। এজন্য ওই ব্যক্তি দুঃখপ্রকাশও করেন।

এদিকে ২৮ অক্টোবরের ঘটনায় বিএনপি তার একজন কর্মী নিহত হওয়ার দাবি করলেও নিহতের পিতার উদ্ধৃতি দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, ওই ব্যক্তি কোনও রাজনীতির সাথে জড়িত নন। তিনি একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত গাড়িচালক ছিলেন। এছাড়া ২৯ অক্টোবর মোহাম্মদপুরে সরকারি দলের কর্মীদের গণপিটুনিতে তাদের এককর্মী নিহত দাবি করলেও পুলিশ বলেছে, ওই ব্যক্তি গাড়িতে আগুন দিয়ে পালাতে গিয়ে একটি নির্মাণাধীন ভবনের উপরে উঠে যায়। পরে সেখান থেকে লাফ দিলে তার মৃত্যু হয়।

বিএনপির এ সমাবেশকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ, পুলিশের ওপর হামলা, পুলিশ হত্যা, সরকারি স্থাপনায় হামলা, প্রধান বিচারপতির বাসভবনে হামলার ঘটনাসহ বিভিন্ন অভিযোগে ৩৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের বিভিন্ন থানায় এসব মামলা দায়ের করা হয়। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) গণমাধ্যম শাখার উপ-কমিশনার ফারুক হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) আটটি বিভাগে এখন পর্যন্ত ৩৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলাগুলোতে নাম উল্লেখ করা আসামির সংখ্যা ১৫৪৪ জন, অজ্ঞাতনামা রয়েছে আরও অনেকেই। মামলা দায়েরের পর ২৮ অক্টোবর ৬৯৬ জন এবং ২৯ অক্টোবর ২৫৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া গত ৯ দিনে ১৭২৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

অপরদিকে পুলিশ কনস্টেবল নিহত হওয়ার ঘটনায় মামলা হয়েছে। মামলায় প্রধান আসামি দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মামলায় মোট ১৬৪ জন আসামির মধ্যে রয়েছেন— বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। এছাড়া পুলিশ হত্যায় সরাসরি জড়িত— এমন দুইজন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যারা বিএনপির কর্মী বলে পুলিশ দাবি করেছে।

যা বলছে বিএনপি শরিকরা

২৮ অক্টোবরের ডেটলাইনের ঘটনা নিয়ে বিএনপি নেতারা বলছেন, অতীতের মতো মহাসমাবেশও শান্তিপূর্ণভাবে করার পরিকল্পনা ছিল বিএনপির। এর মাধ্যমে জনগণ রাস্তায় নেমে সরকারের পতনের আন্দোলনে সমর্থন জানাতে চেয়েছিল তারা। সেই লক্ষ্যে শনিবার দুপুর ২টায় মহাসমাবেশ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সমাবেশ শুরুর আগেই পুলিশ-আওয়ামী লীগের লোকজন হামলা চালিয়েছে। হামলার ঝুঁকি থাকলেও এমনভাবে তা করা হবে, তা ভাবনায় ছিল না বিএনপির।

তারা বলেন, ২৮ অক্টোবরের ঘটনায় আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে পরাজিত হয়েছে। তারা পুলিশ ও কর্মী বাহিনীকে বিএনপির সমাবেশ পণ্ড করতে ব্যবহার করেছে। এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ জনগণকে যে বার্তা দিতে চেয়েছিল, তা প্রত্যাখ্যান করেছে সাধারণ মানুষ— হামলার প্রতিবাদে ডাকা রবিবারের হরতালে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনের মধ্য দিয়ে তা প্রমাণিত হয়েছে। এতে সরকার ও আওয়ামী লীগের ওপর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ বাড়বে। কারণ, সবাই এখন অনেক বেশি সচেতন।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেছেন, বিএনপির শান্তিপূর্ণ মহাসমাবেশ নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার নৃশংস খেলা খেলেছে। পুরো কৌশলটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত। তারা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই সভার অনুমতি দিয়েছিল, যাতে তারা গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য বিরোধী দলের ন্যায়সঙ্গত শান্তিপূর্ণ দাবিকে নস্যাৎ করতে পুলিশের ওপর হামলার অজুহাত ব্যবহার করে ঠান্ডা মাথায় নৃশংস হামলা চালাতে পারে। আওয়ামী লীগ সরকার এটা কৌশলে বিরোধীদলের ন্যায্য দাবিকে বাতিল করার জন্য তৈরি করেছে। এর ফলে একদিনেই বাংলাদেশের পুরো রাজনৈতিক দৃশ্যপট ব্যাপকভাবে বদলে গেছে।

ড. মঈন খান বলেন, মহাসমাবেশের পশ্চিম প্রান্ত থেকে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়া শুরুর আগ পর্যন্ত মহাসমাবেশ পুরোপুরি সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলতে থাকে। তারপর আক্রমণের তীব্রতা বেড়ে যায় এবং বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দসহ সহিংস আক্রমণ পুরো জায়গাটিকে একটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করে। এটা স্পষ্ট যে, পুরো কৌশলটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত।

তিনি বলেন, সরকার ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে সংগঠিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দায় বিএনপির ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে, তার গোমর ইতোমধ্যেই ফাঁস হয়ে গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলে দিয়েছে যে, সরকারের লোকেরাই এসব ঘটনা ঘটিয়েছে। কাজেই সরকারের ২০১৪ সালের ধোঁকাবাজি যে ১০ বছর পরে আর চলবে না, সেটা সরকার বুঝতে পারেনি। আজ এটা দিবালোকে মতো স্পষ্ট হয়ে গেছে যে এভাবে মিথ্যাচার আর জুলুমবাজি দিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষকে আর দমিয়ে রাখা যাবে না।

বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির বিশেষ সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দিন না ঘুরতেই সব স্পষ্ট হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমের বিভিন্ন ছবি-ভিডিওর মাধ্যমে এই সংঘর্ষের মোটিফ কী ছিল, কেন হয়েছে তা ইতোমধ্যে স্পষ্ট। এছাড়া জনগণও সরকারের এসব অপকৌশলে বিভ্রান্ত না— তা তাদের মন্তব্যে বোঝা যায়৷ গতকাল হরতালেও তার চিত্র দেখা গেছে। জনগণ মেনেছে হরতাল। তাই বলবো, আওয়ামী লীগ যতই চেষ্টা করুক না কেন বিএনপিকে থামিয়ে দিতে— জনগণ সঙ্গে আছে। বিএনপি তাদেই দাবি আদায়ে কাজ করছে।

এদিকে সরকার জামায়াতে ইসলামীকে ঢাকায় সমাবেশ করার অনুমতি না দেওয়ার কথা জানিয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে দলটিকে সমাবেশ করতে দেবে না বলেও পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়। তারপরেও মতিঝিলের পরিবর্তে আরামবাগে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করে জামায়াতে ইসলামী। সেখানে কোনও বাধা না দিয়ে বিএনপির সমাবেশে হামলা করা এটা সরকারের দ্বিচারিতা হিসেবে দেখছে বিএনপি। এ নিয়ে ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, 'সংঘাতের একটি শঙ্কা ছিল, তবু আমাদের সমাবেশ করতে হয়েছে। যেখানে জামায়েতে ইসলামী শেষ পর্যন্ত সমাবেশ করে গেলো, কিন্তু বিএনপির সমাবেশ শুরুর আগেই হামলা চালিয়ে পণ্ড করে দেওয়া হলো— এতে সরকারের যে পূর্ব থেকেই একটা পরিকল্পনা ছিল তা পরিষ্কার।

যুগপৎ কর্মসূচির শরিক দল বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই আওয়ামী লীগ নেতারা বিভিন্ন হুমকি দিয়ে আসছিল, আমরা সেটাকে সত্যিকার অর্থে ভেবেছিলাম রাজনৈতিক স্টান্ট, তাদের কর্মীদের উজ্জীবিত করার জন্য বলছিলেন। কিন্তু সত্যই সত্যই যে তারা বিরোধী দলগুলোর মহাসমাবেশের মতো কর্মসূচিতে পুলিশ ও তাদের কর্মী বাহিনী দিয়ে হামলা চালাতে পারে এইটা নিয়ে আমাদের হিসাবে কমতি ছিল, তা অস্বীকার করবো না।

তিনি মনে করেন, আপাত দৃষ্টিতে আওয়ামী লীগ এটাকে বিজয় মনে করছে। তাদের নেতাকর্মীদের কথাবার্তায় উচ্ছ্বাসে তাই প্রকাশ পাচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ কিছু দিন ধরে সংলাপের যে আলোচনা হচ্ছিল তা বন্ধ করে দিয়ে একটা সংঘাতপূর্ণ অবস্থার দিকে নিয়ে গেছে। এতে বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধীদলের পরাজয় হয়েছে— বিষয়টি মোটেই তা না। কারণ এত কিছুর পরেও সরকার জনগণকে যা দেখাতে, যা বোঝাতে চেয়েছে তা দেশের মানুষ গ্রহণ করেনি। জনগণ এখনও একটি নির্দলীয়, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চায়। বিএনপির দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। যা গতকালের হরতালের চিত্রে প্রকাশ পেয়েছে। দূরপাল্লার বাস মালিকদের বলেও রাস্তায় বাস নামাতে পারেনি। জনগণ গতকাল রাস্তায় নামেনি। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় আওয়ামী লীগ যা করছে তা দেশের মানুষের কাছে স্পষ্ট। তারা নিজেরাই রাজনৈতিকভাবে পরাজিত হয়েছে। তারা যে আবারও সংঘর্ষ, সংঘাত, গ্রেফতার, হামলা-মামলার মাধ্যমে বিরোধী পক্ষকে দমন করে আরেকটি জালিয়াতির নির্বাচন করতে চাচ্ছে তা পরিষ্কার করে দিয়েছে বলে মনে করেন সাইফুল হক।

আরও পড়ুন:

ডেটলাইন ২৮ অক্টোবর: যা যা হলো

যেসব শঙ্কা সামনে রেখে পরিকল্পনা সাজাচ্ছে আ.লীগ

/এমএস/
টাইমলাইন: ডেটলাইন ২৮ অক্টোবর
৩১ অক্টোবর ২০২৩, ০০:০৭
২৮ অক্টোবর: কার লাভ কার ক্ষতি?
২৮ অক্টোবর ২০২৩, ২১:৪৮
২৮ অক্টোবর ২০২৩, ১৭:১৪
২৮ অক্টোবর ২০২৩, ১৬:৫১
২৮ অক্টোবর ২০২৩, ১৬:৪১
২৮ অক্টোবর ২০২৩, ১৬:১৭
২৮ অক্টোবর ২০২৩, ১৫:৫৭
২৮ অক্টোবর ২০২৩, ১৫:৩৬
সম্পর্কিত
প্রধান বিচারপতির বাসভবনে হামলা: মির্জা ফখরুল ও আমির খসরুর জামিন 
জামিন হয়নি মির্জা ফখরুলের
তালা ভেঙে বিএনপি কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ নিলেন নেতাকর্মীরা
সর্বশেষ খবর
বইমেলায় এখনও নজরুল-রবীন্দ্রনাথেই আগ্রহ বেশি
বইমেলায় এখনও নজরুল-রবীন্দ্রনাথেই আগ্রহ বেশি
দিল্লির ‘রাইসিনা ডায়ালগে’ ঢাকার মাসুদা ভাট্টি ও শেখ ফাহিম
দিল্লির ‘রাইসিনা ডায়ালগে’ ঢাকার মাসুদা ভাট্টি ও শেখ ফাহিম
বাগদাদে এশিয়া কাপ আর্চারিতে ফাইনালে বাংলাদেশ
বাগদাদে এশিয়া কাপ আর্চারিতে ফাইনালে বাংলাদেশ
এক্সপ্রেসওয়েতে ট্রাক-বাস সংঘর্ষে ৪ জন নিহত
এক্সপ্রেসওয়েতে ট্রাক-বাস সংঘর্ষে ৪ জন নিহত
সর্বাধিক পঠিত
দুঃখ ঘুচছে উত্তরের, দূরত্ব কমবে ১১২ কিমি
দুঃখ ঘুচছে উত্তরের, দূরত্ব কমবে ১১২ কিমি
লিবিয়ার ‘গেমঘর’ থেকে ফিরে নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা তরুণের
মানবপাচারলিবিয়ার ‘গেমঘর’ থেকে ফিরে নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা তরুণের
৫ লাখ শিক্ষক-কর্মচারীকে অবসর সুবিধা দিতে হাইকোর্টের রায়
এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান৫ লাখ শিক্ষক-কর্মচারীকে অবসর সুবিধা দিতে হাইকোর্টের রায়
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে ‘নতুন অধ্যায়’: কী চায় দুই দেশ?
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে ‘নতুন অধ্যায়’: কী চায় দুই দেশ?
বইমেলা থেকে বের করে দেওয়ায় ডিবি কার্যালয়ে গেলেন হিরো আলম
বইমেলা থেকে বের করে দেওয়ায় ডিবি কার্যালয়ে গেলেন হিরো আলম