ভারতের ভোপালে ১৯৮৪ সালের ৩ ডিসেম্বর প্রথম প্রহরে মার্কিন মালিকানাধীন ইউনিয়ন কার্বাইড কীটনাশক কারখানার ভূর্গভস্থ মজুত ট্যাংক ফেটে গেলে সেখান থেকে বেরিয়ে পড়ে ৪০ টন পরিমাণ বিষাক্ত গ্যাস মিথাইল আইসোসায়ানেট।
পরে ইউনিয়ন কার্বাইড ইন্ডিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াই পি গোখেল জানিয়েছিলেন, অতিরিক্ত চাপের মুখে ট্যাংকের একটি ভালভ ভেঙে গেলে ভেতর থেকে গ্যাস বের হতে শুরু করে।
৯ লাখেরও বেশি বাসিন্দার ঘনবসতির শহর ভোপালের আকাশে ছড়িয়ে পড়ে মারণাত্মক রাসায়নিকের মেঘ।
প্রায় ৫ লাখ মানুষ ওই গ্যাসের কবলে পড়ে। প্রাণ হারায় কয়েক হাজার মানুষ। গ্যাসের ওই মেঘ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যায় মারাত্মক রোগব্যাধির অভিশাপ। পরিবেশবাদীরা বলে আসছেন, ওই কারখানা থেকে নির্গত বিষ এখনও এলাকার মাটি ও ভূগর্ভস্থ জলকে বিষাক্ত করছে।
২০২০ সালে ভারতের নৈহাটিতে এক বিস্ফোরণের পর একই ধরনের প্রতিক্রিয়ার শঙ্কা করেছিলেন পরিবেশবাদীরা। পরিবেশবিজ্ঞানী অর্ক চৌধুরী ভারতীয় গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বাতাসে ধাতব অক্সাইড মিশে যাওয়ার ফলে মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে কষ্ট হবে। যে জায়গায় বিস্ফোরণ হয়েছে— সেই জমিতে বাড়তি রাসায়নিক মিশে যাবে। এতে করে ফসলের বিরাট ক্ষতি হবে। এছাড়া নদীর পাড়ে বিস্ফোরণটি ঘটায় নদীর জলেও রাসায়নিক মিশেছে, যাতে ক্ষতি হবে মাছেদেরও। এছাড়া গঙ্গা থেকে জল পরিশোধনের মাধ্যমে কোথাও যদি পানীয় হিসেবেও সরবরাহ করা হয়, সেই পানীয় জলেও প্রভাব পড়বে।’
প্রশ্ন হলো কী হবে সীতাকুণ্ডে, যেখানে কিনা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেমিক্যাল পুড়েছে শনিবার রাত থেকে। মূলত এই ডিপোটি কাসেম জুট মিলের ভেতরে একটা অংশে তৈরি করা হয়। আগুন লাগার পরে বিস্ফোরিত হতে থাকে একের পর এক কন্টেইনার। আন্দাজ করা হচ্ছে, সেখানে হয়তো হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের মতো কেমিক্যালও থাকতে পারে।
জানা গেছে, সাবেক কাসেম জুট মিলের জমি বিজিএমসির কাছ থেকে নিয়ে ২৬ একর জমির ওপরে বেসরকারি বিএম কন্টেইনার ডিপো তৈরি করা হয়। এর চারদিকে সীমানা প্রাচীর আছে। তবে বাউন্ডারি সংলগ্ন ঘরবাড়ি আছে। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় চমেক হাসপাতালের সামনে সাংবাদিকদের বলেছেন, বিএম ডিপো থেকে বঙ্গোপসাগরে কেমিক্যাল ছড়িয়ে পড়ার সংবাদ সত্য নয়। পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে আছেন, তারা সার্ভে করছেন। যে খাল দিয়ে পানি সাগরে যায়, সেটি বন্ধ করে দিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও চিকিৎসক লেনিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সেখানে নানা ধরনের রাসায়নিক ছিল। স্থানীয়ভাবে বায়ু কতটুকু দূষিত হয়েছে— তার পরিমাপ হওয়া দরকার। আবার বিস্ফোরণের সময় বিকট শব্দ হয়েছে, সেটা শ্রবণ ইন্দ্রিয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। আগামীতে বেশকিছু জরিপ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যাতে মানুষ ক্ষতির মুখোমুখি না হয়।’
জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. শাহেদুর রহমান খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কেমিক্যাল মিশ্রিত বাতাস গ্রহণ করলে তাৎক্ষণিক নানা ধরনের সমস্যা হতে পারে। আবার দীর্ঘ মেয়াদি সমস্যাও হতে পারে। দূষিত বাতাসে দীর্ঘক্ষণ থাকলে কারও যদি শাস কষ্টের সমস্যা থাকে,সেটি বেড়ে যাবে। ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভপালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডি থাকলে সেটি বেড়ে যাবে। এগুলো তাৎক্ষণিক হবে। এছাড়া চোখ জ্বালা করবে, চোখ দিয়ে পানি পড়বে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যদি দীর্ঘ মেয়াদি কেউ এরকম পরিবেশে থাকে, তাহলে সিওপিডি এমনকি ক্যান্সারও হতে পারে। শিশুরা এমন পরিবেশে থাকলে ফুসফুসের গ্রোথ হবে না। সে যখন প্রাপ্তবয়স্ক হবে, তার ফুসফুসের রিজার্ভ কম হবে। আমাদের ফুসফুস জন্মের ১০ বছর পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাই শিশুকে যদি এমন পরিবেশে রাখা হয়, তাহলে প্রাপ্তবয়স্ক হলে তার ক্যাপাসিটি বাড়বে না। অল্পতেই হয়রান হয়ে যাবে, শারীরিক ফিটনেস থাকবে না। গর্ভবতী মা যদি এরকম পরিবেশে থাকে, তাহলে তার গর্ভের সন্তান নষ্ট হতে পারে, জন্মের পর ওজনে কম হতে পারে। আবার সেই শিশুর বিভিন্ন ধরনের রোগ হতে পারে।গর্ভের জন্য ঝুঁকি হতে পারে।’









