প্রতিবেশী আফগানিস্তানে যখন তালেবান নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করছে তখন অনেক পাকিস্তানির কাছে বিষয়টি উদযাপনের উপলক্ষ। একাধিক শহরে পাকিস্তানের ইসলামি সংগঠনগুলো মিষ্টি বিতরণ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাকিস্তানের যুদ্ধের ব্যর্থতা নিয়ে সমালোচনা করা হচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে পশ্চিমা বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনাকে ব্যঙ্গ করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিশেষ সহকারী রাউফ হাসান টুইটারে লিখেছেন, দুর্নীতি পরায়ণ গণি সরকারের কাছ থেকে তালেবান কার্যত শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা গ্রহণ করছে। সোমবার ইসলামাবাদে ইমরান খানও একটি কৌতুহল জাগানিয়া মন্তব্য করেছেন। পাকিস্তানের সমাজে ইংরেজি ভাষার সংস্কৃতি এবং মানসিক দাসত্ব নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, তালেবান দাসত্বের শেকল ভেঙেছে।
এখন পর্যন্ত কাবুলে তালেবান শাসনকে স্বীকৃতি দেয়নি খান সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সমালোচক ইমরান খান সব পক্ষকে নিয়ে রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। পাকিস্তানের অস্থিতিশীলতার জন্য তারা যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিদেশি শক্তিকে দায়ী করে আসছে। গত মাসেই দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মোয়েদ ইউসুফ বলেছেন, পাকিস্তান গত ৪০ বছর ধরে এসবে ভুগছে।
বছরের পর বছর ধরে আফগান তালেবানরা পাকিস্তানের সহযোগিতা পেয়েছে, বিশেষ করে দেশটির সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনায় আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গণি পাকিস্তানের একটি দাবি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। পাকিস্তান দাবি করে আসছিল তাদের দেশ আফগান তালেবানদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় নয়। গণি বলেছিলেন, ‘যে কেউই বলতে পারে পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘুরে না’।
তালেবানের দীর্ঘদিনের সশস্ত্র যুদ্ধ ও দ্রুততার সঙ্গে আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সঙ্গে পাকিস্তান সম্পর্কিত। অর্ধ শতাব্দী ধরে পাকিস্তান আফগানিস্তানে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো পরিচর্যা করেছে নিজেদের আঞ্চলিক কৌশলের অংশ হিসেবে। তালেবানে অঙ্গীভূত হওয়া এসব উপগোষ্ঠী পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে লজিস্টিকস ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখে। এছাড়া তালেবানের অনেক যোদ্ধাই এসেছে সীমান্তের উভয় পাশের জাতিগত ও আদিবাসী অংশ থেকে।
পাকিস্তানি এস্টাব্লিশমেন্টের কাছে তালেবানের আহ্বান ছিল রাজনৈতিক ও কৌশলগত। এমনকি ২০০১ সালের অভিযানের সময় ও পরে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে ভূমিকা রেখেছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ইন্সটিটিউট অব পিস প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তালেবানের সঙ্গে জড়িত হাক্কানি নেটওয়ার্কের সঙ্গে আইএসআই-এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
এটি দীর্ঘদিন ধরে ওপেন সিক্রেট। সাবেক আইএসআই প্রধান হামিদ গুল ২০১৪ সালে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘যখন ইতিহাস লেখা হবে তখন উল্লেখ থাকবে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় সোভিয়েত ইউনিয়নকে পরাজিত করেছে আইএসআই। পরে আরেকটি বাক্য থাকবে। সেটি হলো আমেরিকার সহযোগিতায় আমেরিকাকে পরাজিত করেছে আইএসআই’।
এখন আফগানিস্তানে দায়িত্ব পালন করা সাবেক ইউরোপীয় ইউনিয়ন কর্মকর্তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছেন। ফরেইন পলিসিতে এই সপ্তাহে একাডেমিক সি. ক্রিস্টাইন ফেয়ার লিখেছেন, পাকিস্তানের গোয়েন্দা ও সামরিক সংস্থার সহযোগিতা ছাড়া তালেবান কার্যকর লড়াইয়ের বাহিনী হতে পারত না। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে একটি বিষয় এড়িয়ে গেছে, তা হলো- ইসলামি জঙ্গিবাদকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া পাকিস্তানের ‘ডিপ স্টেট’-এর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা জারি করা।
সমালোচকরা বলছেন, আফগানিস্তানে তালেবানের অগ্রগতি আড়াল করতে শান্তি আলোচনা মনোযোগ সরিয়ে রাখার কাজ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র কাবুলে যে সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র চাইছে চরম রক্ষণশীল সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর এই বিষয়ে কোনও আগ্রই ছিল না।
এক নিবন্ধে পাকিস্তানি সাংবাদিক হামিদ মির লিখেছেন, কাবুল দখলের ফলে গত বছর দোহায় যুক্তরাষ্ট্র ও আফগান তালেবানের চুক্তি ভেঙে পড়েছে। এটি এখন কার্যত মৃত। এখন আমরা জ্যান্ত অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। অন্য যে কোনও আঞ্চলিক শক্তির চেয়ে পাকিস্তানকে বেশি গভীরভাবে প্রভাবিত করবে।
সূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট









